এই পোস্টটি ১,১৬৭ বার পড়া হয়েছে


হেগা চাঙমার বক্তব্যের সূত্র ধরে: লড়াইকে এগিয়ে নেয়ার দায়িত্ব আমাদের সবার

আজ(৩০ সেপ্টেম্বর, ২০১৩) ফেসবুকে হেগা চাঙমা নামে এক ফেসবুক বন্ধুর কমেন্ট চোখে পড়লো। মন্তব্যটি পড়ার পর কিছু লিখতে ইচ্ছে হলো। হেগা চাকমা বলতে চেয়েছেন, ইদানীং পার্বত্য চট্টগ্রামের দলগুলো উচ্চশিক্ষিত বা লেখাপড়া জানা ছাত্র-ছাত্রীদের সাথে মতবিনিময় সভারআয়োজন করেছে। তবে এই মতবিনিময় সভার আয়োজনকে তিনি দলসমূহের দিক থেকে “তালগাছটা আমার” টাইপের বলেই মনে করেছেন। এবং এই দৃষ্টিভঙ্গিকে তিনি সমালোচনাও করেছেন।

তিনি লিখেছেন-

এসব মতবিনিময় সভায় অংশ নেয়া কয়েকজন ছাত্রের সাথে কথা বলে জানা গেছে, মতবিনিময়ের আড়ালে এগুলো আসলে দলীয় প্রচারণা ভিন্ন অন্য কিছু নয়। তাদের অনেকের মতে- রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থান এখনো “তালগাছটা আমার”।

এছাড়া তিনি আরো বলেছেন-

প্রশ্ন হচ্ছে- রাজনৈতিক দলগুলো জনগণের সাথে কথা বলে কি নিজেদের মধ্যে গুনগত পরিবর্তন ঘটাবেন, নাকি আঁকড়ে থাকবেন পুরনো চিন্তায়?

এছাড়া তিনি বলেছেন-

এসব আলোচনায় সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীদের বিশাল অংশ বাস্তবতার কথা মাথায় রেখে নীরব থাকলেও বেশ কিছু ছাত্র-ছাত্রী বর্তমান বাস্তবতা নিয়ে দলগুলোর ভূমিকা ও কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রকাশ্যে সমালোচনা করেন।

লেখাটি পড়ে আমার মনে হয়েছে এ নিয়ে কিছু বলা দরকার।

প্রথমে, বলে রাখি জাতিসত্তার বা পার্বত্য জুম্ম জনগণের অধিকার আদায়ের সংগ্রাম কারো একার বা কোনো দলের গচ্ছিত সম্পত্তি নয় এই কথাটি আমি ব্যক্তিগতভাবে বিশ্বাস করি এবং এই আদর্শই লালন করি। এবং একই সাথে এই দৃষ্টিভঙ্গিকে আমি একটি আদর্শ হিসেবেই দেখি!  সুতরাং, “তালগাছটা আমার” টাইপের বক্তব্য যদি দলগুলো থেকে এসে থাকে তবে এ নিয়ে সমালোচনা করা বা আলোচনা করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ বলেই মনে হয়।

এবং এই বিষয়টির দিকে খেয়াল রেখেই আমি আলোচনায় অংশ নিতে আগ্রহান্বিত বোধ করছি। কিছু কিছু আলোচনা আছে যাকে প্রলম্বিত করতে হয়! এখানে হেগা চাঙমার মন্তব্য পড়ে কোন মন্তব্য না করে থাকলেই বোধহয় বেশি ভালো হতো বলে মনে হয়ে থাকতে পারে! কিন্তু এই আলোচনার সূত্র ধরে কিছু বিষয় আলোচনায় উঠে যদি উঠে আসে এবং  এসব পড়ে যদি কেউ সাধারণ কিছু ধারণাও পান বা নতুন কিছু চিন্তা ভাবনা করতে উদ্বদ্ধ হন তবে আমার মতে ফেসবুকে বা ব্লগে লেখার সার্থকতা চলে আসবে।

আর তেমন কোন কথা না বাড়িয়ে  আমার বক্তব্য তুলে ধরার চেষ্টা করছি সংক্ষেপে-

 

(ক) দলীয় প্রচারণা প্রসঙ্গে- একটি পার্টি বা সংগঠনের কাজই হচ্ছে সংগঠিত করা বা নির্দিষ্ট এলাকার নির্দিষ্ট জনগণকে সংগঠিত করাই হচ্ছে একটি পার্টি বা দলের কাজ। সুতরাং, দলীয় প্রচারণা যে কেউই করবেই। এটা হচ্ছে আমার অভিমত। এবং একে বাঁকা চোখে বা সমালোচনার চোখে দেখাটাকে বোধহয় আমি সমর্থন করতে পারি না!  বরং পার্টি বা দলগুলো যে জনগণ বা ছাত্রসমাজের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছে, এই বিষয়টিকে আমার চোখে আমি  ইতিবাচক হিসেবেই দেখি।

সুতরাং, বিষয়টিকে দলীয় প্রচারণা এই ঢঙে না ভেবে দলগুলোর বৃত্তবন্দি অবস্থা থেকে বেড়িয়ে আসার ইতিবাচক প্রবণতা হিসেবে বিষয়টিকে দেখতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি। পার্বত্য চট্টগ্রামের মতো নিপীড়িত একটি অঞ্চল তথা জনগোষ্ঠীর জন্য দল বা পার্টি বা সংগঠিত শক্তির ভূমিকা যেমন গুরুত্বপূর্ণ তেমনি এই শক্তিকে সহযোগিতা করে নিজে সক্রিয় থেকে শক্তিকে বা দলসমূহকে শক্তিপ্রদান করাটাও খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

 

(খ) তালগাছটা আমার বিষয়ে-

আমার এতো বছরের রাজনৈতিক জীবন এবং একই সাথে বিশ্বের নানা দেশের রাজনৈতিক উত্থানপতন বিষয়ে আলোচনা বা পড়ালেখা করতে পাবার সুযোগে এই বিষয়টিতেই আমি উপনীত হতে পেরেছি যে, সংগঠিত একটি শক্তি যা অধিকার আদায়ের লক্ষে বা নিপীড়িত জনতার মুক্তির জন্য কাজ করেছে বা করছে বা করেছিলো, সে সংগঠিত শক্তি বা সংগঠনের মধ্যে এক পর্যায়ে “আমলাতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি” গেড়ে বসে। একে আমরা “আয়েশি ভাব পাওয়া“ও বলতে পারি। চীনে বিপ্লবের পরে মাও সেতুঙকে “গ্রেট প্রলেটারিয়ান কালচারাল রেভল্যুশন”এর ঘোষনা এই জন্যই দিতে হয়েছিল।

আমাদের পার্বত্য চট্টগ্রামের দলগুলোর ক্ষেত্রেও এই প্রবণতাই আমরা প্রত্যক্ষ করে থাকি!

রাজনীতিতে আমলাতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি আসা মানে হচ্ছে, মেদভুড়ি বেড়ে যাবার মতো! কিন্তু আমরা পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রেক্ষাপটে এই আমলাতান্ত্রিকতাকে কিভাবে দেখবো?

এখানে আমি পূর্বে বলেছি, পার্টি বা দল ব্যতীত বা সংগঠিত শক্তি ব্যতিত আমাদের বা পার্বত্য জনগণের নির্ভর করার তেমন কিছুই নেই! যেহেতু এখন পার্বত্য চট্টগ্রামে তিনভাগে বিভক্ত হওয়া দলসমূহই রয়েছে, এবং যেহেতু বস্তুগতভাবে নতুন আরো কোনো দল বা সংগঠিত শক্তি এখনো সৃষ্টি হয়নি বা এখনো নতুন সংগঠিত শক্তির উত্থান হয়নি তাই এই দলগুলোই হলো আমাদের মতো নিপীড়িত জনগণের প্রধান শক্তি। এ সকল দলের সমস্যা-দুর্বলতা-দৃষ্টিভঙ্গির নানা বিভ্রান্তি বিবেচনা করেই আমাদের এই সকল দলের উপরই নির্ভর করতে হয়!

এবং সেই দিকটি বিবেচনা করেই দলবিবেচনা ব্যতিরেকে বলছি, এই ‘তালগাছটি আমার’ দৃষ্টিভঙ্গি যা আমলাতান্ত্রিক যে দৃষ্টিভঙ্গি, তার প্রতি আমাদের কড়া সমালোচনা করা  দরকার।  কিন্তু এই সমালোচনার ধরণ এমন হবে না যে, আমরা কোনো অপরিচিত বা কো দূরবর্তী কাউকে সমালোচনা করছি বা এমন হবে না যে কোনো শত্রু কাউকে আমরা সমালোচনা করছি!

সংগঠিত থেকে বা সংগঠনের মধ্যে থেকে অধিকার আদায়ের কথা যারা বলছেন বা যারা এই দায়িত্ব কাঁধে নিতে চেষ্টা করেছেন তাদের দিকে বা তাদের বাস্তবতার দিকে  না তাকিয়ে শুধু ভুলের সমালোচনা করাটা বোধহয় সমস্যাটির সমাধানের প্রকৃত সূত্র নয়!

কিন্তু আমরা আমাদের শিক্ষিত এবং সচেতন দাবি করেন  এই অংশটিকে দেখি যে, তারা সমালোচনা করেই ক্ষান্ত থাকেন! কিন্তু দায়িত্ব পালনে সচেষ্ট তেমন থাকেন না!

পার্টি বা দল গঠনের ইতিহাস কী বলে!? পার্টি বা দল গঠনের ইতিহাস বলে, যখন কোনো দুর্যোগ মুহূর্ত বা ক্ষণ বা সময় পাড়ি দিতে হয় তখন এই ‘শিক্ষিত’ এবং ‘সচেতন’ অংশটি ব্যক্তিস্বার্থ বা নিজের আখের গোছানোতে বেশি মনোযোগ দিয়েই যেন থাকে! দুর্যোগ উপস্থিত হলেই তারা নিচের তলার তাদের বন্ধু সহযোদ্ধাদের ফেলে চলে যায়!(এ কথা আমি ইতিহাসকে জানার সুবিধার্থে বলছি মাত্র, কাউকে আঘাত দেবার জন্য বা নতুন কোন বিতর্ক সৃষ্টি করার জন্য আমার এই মন্তব্যের অবতারনা নয়)

যাই হোক,’তালগাছটি আমার’ প্রসঙ্গটি নিয়ে আলোচনা করার সূত্র ধরে আমাকে অনেক কথা বলতে হলো, যা দারুণভাবে কাউকে না কাউকে আঘাত করার মতোই হতে পারে! কিন্তু বাস্তবতাকে বোঝাতে আমাকে এই কথা বলতে হলো।

শিক্ষিত বা উচ্চ শিক্ষিত বা সচেতন অংশের প্রতি দাবি হচ্ছে-

১. দলসমূহকে ভালোবাসুন। এ সকল দলের ভুল বা সীমাবদ্ধতাকে নিজের দুর্বলতা বা সীমাবদ্ধতা বলে মনে করুন।

২.  এই বোধটি বজায় রেখে এবং বাস্তবত, এ বিষয়ে সজাগ থেকে পার্টির মধ্যে যে আমলাতান্ত্রিকতার সৃষ্টি হয়ে থাকে তার কড়া সমালোচনা করুন। এবং একই সাথে এই গেড়ে বসা আমলাতান্ত্রিকতার সমাধান কীভাবে করা যায় তা নিয়ে বাস্তবে কিছু একটা করার চেষ্টা করুন। শুধু সমালোচনা এবং উদ্দেশ্যহীন সমালোচনা সমর্থনযোগ্য হতে পারে না।

৩. কোন বিষয়কে ভালোভাবে জেনেবুঝে সমালোচনা করাটা্ এখন সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ। শুধু হুজুগের বশে বা অল্প জেনেবুঝে বা কিছ সময়ের জন্য হঠাৎ গজিয়ে ওঠা মনের ঝাল মেটাতে শুধু সমালোচনার জন্য সমালোচনা কোনো পক্ষের জন্য শুভ কিছু বয়ে আনবে না।

৪. এখানে বলে রাখা দরকার অধিকার আদায়কামী চরমভাবে নিপীড়িত একটি দল বা পার্টিকে শত্রুকে ধোকা দেবার জন্য নানা কসরত করতে হয়। অনেক সময় এই কসরত এমন পর্যায়ে চলে যায় যে তা সুবিধাবাদীতার আমদানিও ঘটাতে পারে! এদিক থেকে এই সুবিধাবাদীতার সৃষ্টি তাত্ত্বিক দিক থেকে  স্বাভাবিক। কিন্তু তার বিমোচন বা তার সমাধান ঘটানো বাস্তবে অনেক কঠিন। কিভাবে এই সুবিধাবাদীতার সমাধান করা যেতে পারে?

 

একমাত্র নতুন জেনারেশন বা নতুন শিক্ষিত অংশের সচেতন সক্রিয় প্রয়াসই তার বিমোচন ঘটাতে পারে! এবং এই অংশটি যত পরিমাণে নিজেকে আন্দোলনের প্রতি, অধিকার আদায়ের প্রতি সচেষ্ট রাখতে পারবে ততই পার্টি বা দলসমূহকে ‘প্রস্তরিভূত অবস্থা’ থেকে বেরিয়ে আসতে তা সহায়কই হবে।

নিপীড়নের শিকার ছোট একটি জনগোষ্ঠীর জন্য শুধু পার্টিগত লড়াই মুখ্য হতে পারে না! সামষ্টিকভাবে লড়াইয়ের সাথে সকল অংশকে যুক্ত করতে পারার মধ্যেই এই লড়াইয়ে বিজয়ী হওয়া নির্ভর করে। কিন্তু এই সকল অংশকে যুক্ত করার দায়িত্ব কার? এই দায়িত্ব যেমন পার্টি বা দলসমূহের তেমনি এই দায়িত্ব সচেতন সজাগ সকলের।

এই দায়িত্ব পালনে গাফিলতি আন্দোলনে গতিহীনতা ডেকে আনবে তা স্বাভাবিক! এবং এজন্য দায়ভার শুধু পার্টির তো নয়! তার দায়ভার সকলের! এবং তার দায়ভার সবচেয়ে বেশি তাদের উপর বর্তায় যারা শিক্ষিত সচেতন!

সুতরাং, ভুলের দায়ভার অপরকে দিয়ে নিজেকে শুদ্ধসাঙ্গ রাখাটা শুভকর নয় আমাদের অধিকার আদায়ের লড়াইয়ের জন্য।

এই সামষ্টিক দায়ভার আমরা সকলে একত্রে  নিতে সচেষ্ট থাকবো এই প্রত্যাশাই শুধু রাখি!

ধন্যবাদ হেগা চাঙমাকে পার্বত্য চট্টগ্রামের আন্দোলনে কার কী ভূমিকা থাকা দরকার সে বিষয়ে মন্তব্য করার সুযোগ করে দেবার জন্য।

[ এখানে বলে রাখি, আমি ব্যক্তিগতভাবে বাস্তব আন্দোলনে বা বাস্তব লড়াইয়ে ছাত্র-জনতার শক্তিকে ধারাবাহিক কর্মসূচি প্রদানের মাধ্যমে স্বাভাবিক ঐক্য সৃষ্টির মতো পদক্ষেপে বিশ্বাসী! কিন্তু যেহেতু এখন আমরা সীমাবদ্ধতার সূত্র দ্বারা অবরুদ্ধ এক সময় পাড় করছি তাই এই লেখাটি লিখে জানাতে হলো নিজের মতামত! নাহলে আমি শুধু নিজের মতামত দিয়ে ক্ষান্ত থাকাতে বিশ্বাস করি না! বাস্তব কাজ হচ্ছে গুরুত্বপূর্ণ, কথার ফুলঝুরি নয়!  ]

 

 

 

Advertisement