এই পোস্টটি ৫২৮ বার পড়া হয়েছে


খাগড়াছড়িতে ২০০১ সালে আয়োজিত সাহিত্য সম্মেলনে পাঠকৃত লিখিত বক্তব্য

প্রয়োজনীয় উদ্ধৃতি

উদ্ধৃতি-১

বীরপুরুষ মুখ্যভাবে তরবারিকে আপনার অস্ত্র বলিয়া জানে; কিন্তু বীরত্বগৌরব সেইটুকুতেই তৃপ্ত থাকিতে পারে নাই, সে তরবারিতে কারুকার্য ফলাইয়াছে।

সূত্র- রবীন্দ্র নাথ; সাহিত্যসম্মিলন’ ফাল্গুন, ১৩০১।

উদ্ধৃতি-২

কোনো দেশে যখন অতিমাত্রায় প্রয়োজনের কাড়াকাড়ি পড়িয়া যায় তখন সেখানে সাহিত্য নির্জীব হইয়া পড়ে। কারণ, প্রয়োজন পরকে আঘাত করে, পরকে আকর্ষন করেনা।(সূত্র:ঐ)

উদ্ধৃতি-৩

জগতে যে জাতি দেশকে ভালোবাসে সে অনুরাগের সহিত স্বদেশের সন্ধান নিজে রাখে, পরের পুঁথির প্রত্যাশায় তাকাইয়া থাকে না; স্বদেশের সেবা যথাসাধা নিজে করে, কেবল পরের কর্তব্যকে জাগ্রত করিবার উপায় সন্ধান করেনা; এবং দেশের সমস্ত সম্পদকে নিজের সম্পূর্ণ ব্যবহারে আনিতে চেষ্টা করে, বিদেশ্য ব্যবসায়ীর অশুভাগমনের প্রতীক্ষায় নিজেকে পথের কাঙাল করিয়া রাখে না। তাই আজ আমি আমাদের ছাত্রগণকে বলিতেছি, দেশের উপর সর্বাগ্রে সর্বপ্রযত্নে জ্ঞানের অধিকার বিস্তার করো, তাহার পরে প্রেমের এবং কর্মের অধিকার সহজে প্রশস্ত হইতে থাকিবে।(সূত্র: ঐ)

 

২০০১ সালের জুন মাস। কিছুদিনের জন্য ভার্সিটি বন্ধ ছিলো। খাগড়াছড়িতে আসলাম। “স্ফুরণ” নামে একটি ছোটো ম্যাগাজিন তখন আমরা প্রকাশ করতাম। সেই প্রকাশনাটির সূত্রে আমার স্কুলের কয়েকজন ছাত্রের সাথে পরিচয় হয়। চিন্তা করলাম, তাদের নিয়ে একটি ছোট সাহিত্য সম্মেলন করবো! আদতে সাহিত্য সম্মেলন যে বিরাট একটা কিছু তা জানা থাকার পরও যেহেতু কোনো কাজ না হওয়ার চেয়ে কিছু কাজ অন্তত হওয়া ভালো, এই চিন্তা করে আসলে এই উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল।

আমি সাহিত্য সম্মেলনটি করার মন নিয়ে খাগড়াছড়ি গেলাম।

তখন স্ফুরণ-এর জন্য কাজ করতো সরসিজ, রাতুল, চন্দন ও বিজয়া। তাদের ডেকে সাহিত্য সম্মেলন করার কথা  বললাম। তারাও সায় দিলো। আমরা ১৬-১৭ জুনকে বেছে নিলাম সম্মেলন করার দিন হিসেবে। সিদ্ধান্ত নিলাম খাগড়াছড়ি সদরের পানখাইয়া পাড়া মারাম উন্নয়ন সংসদের দ্বোতলায় আমরা উক্ত প্রোগ্রাম করবো।

উক্ত প্রোগ্রামে বোধহয় ২৫-৩০ জনের মতো ছাত্র-ছাত্রী অংশ নিয়েছিল। আর অতিথি হিসেবে পেয়েছিলাম শ্রদ্ধেয় শিক্ষক অন্তত বিহারী খীসা, পেরাছড়া উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক বিম্বিসার খীসা, অংক্যজাই মারমা টকী প্রমুখকে।

এছাড়া আমার বন্ধু রুপন চাকমাও সেখানে ছিলো।

আসলে হানাহানি পরিস্থিতি, একই সাখে পার্বত্য চট্টগ্রামে সেনা নিপীড়নমূলক পরিস্থিতি ইত্যাদির কারণে বু্দ্ধিবৃত্তিক কর্মসূচি তখন খাগড়াছড়িতে খুব কমই হতো বা হতো না বললেই চল। কয়েকবছর আগেও যেখানে খাগড়াছড়ির বিভিন্ন এলাকায় বই পড়ার ক্লাব গড়ে উঠেছিল। কিন্তু নানা কারণে তার ধারাবাহিক বিকাশ বা তাকে এগিয়ে নিয়ে যাবার ধাত তখন গড়ে ওঠেনি। আমি যখন খাগড়াছড়িতে স্কুলের ছাত্র ছিলাম তখন আমি হবংপুজ্জে এলাকায় অবস্থিত হয়াঙ বোই-ও-বা’তে যেতাম- বই ধার নিয়ে পড়তাম। এছাড়া মিলনপুরে রেগা লাইব্রেরী নামে একটি বই পড়ার ক্লাব ছিলো। আমি সেই ক্লাবেরও সদস্য ছিলাম। এবং বই ধার নিয়ে পড়তাম।

আর খাগড়াছড়ি উচ্চ বিদ্যালয়ের সামনে পাবলিক লাইব্রেরিতে স্কুল ছুটি অথবা টিফিন ছূটিতেও বই পড়তে যেতাম। মনে আছে চীন থেকে প্রকাশিত একটি খুব ভালো ছবি সম্বলিত ছোটোদের পড়ার বই ছিলো। নাম সুন উখোং। এই বইয়ের ৩০-৩৫ টি খন্ড।মনে আছে আমরা সবাই সেই বইগুলো কাড়াকাড়ি করে পড়তাম।  খুব মনকাড়া ছিলো সেই বইটি। আজও মাঝে মাঝে সেই বইটি খূজি। কিন্তু কোথাও পাইনি।

খাগড়াছড়িতে বই পড়ার ক্লাব বা এ নিয়ে হয়তো পড়ে লেখা দরকার বলে মনে হচ্ছে। কিন্তু আামার সেই স্মৃতির কথা আর তেমন মনে নেই।

যাহোক, আজ আমি এখানে সেই সাহিত্য নামক সম্মেলনে আমরা যে একটি লেখা বা ঘোষনা পাঠ করেছিলাম তা তুলে ধরছি।

 

অনেক দিক  বিবেচনায় সেই সম্মেলনটির সীমাবদ্ধতা সাদাচোখে দেখা যায়। কিন্তু সেই সম্মেলন করার যে বাস্তব অভিজ্ঞতাকে তাকে আমি কখনো খাটো করি না। খেলাচ্ছলে বা ঝোঁকের মাথায় তা করলেও এ ধরণের সাহিত্য সম্মেলন সিরিয়াসভাবে করার প্রয়োজনীয়তা আমি এখনো অনুভব করি। আশাকরি আমরা আগামী দিনে এমন সাহিত্য সম্মেলন করতে পারবো যা কোনো এনজিওর অর্থায়নকৃত বা আপোষমুখী হবে না।

ন্য কথা না বলে নিচে সেই ঘোষনাটি তুলে ধরছি-

সাহিত্য সম্মেলনের ঘোষনা

সম্মানিত এবং শ্রদ্ধেয় আলোচকবৃন্দ এবং আজকের এই নবীন লেখক সম্মেলনে উপিস্থত সকল শ্রোতাবৃন্দ- আমরা জুম্ম ছাত্রছাত্রীরা আমাদের সেনসিটিভ চোখ দিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামের বর্তমান আর্থসামাজিক রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে দেখি। এবং চারপাশের ঘটনা আমাদের মর্মাহত করে, কষ্ট দেয়, আমরা কূল খূঁজে পাই না। আপনারা জানেন, সমাজের সবচেয়ে স্পর্শকাতর অংশ হচ্ছে ছাত্রছাত্রীরা। এই  ছাত্রছাত্রীদের একটি অংশ আজ নেশার পাকচক্রে নিমজ্জিত হয়ে নিজের জীবনের ভবিষ্যতকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। এবং ধ্বংস ডেকে আনছে জাতির ভবিষ্যতের।

অভিভাবক সমাজ প্রচলিত সমাজকাঠামোর আষ্ঠেপৃষ্ঠে নিজেকে বেঁধে রেখেছে- সংকীর্ণতা ভীতি তার রন্ধ্রে রন্ধ্রে। সমাজের কাজকে তারা নিজের কাজ মনে করেনা। নিজের ছেলেমেয়ে ছাড়া সমাজের জন্যও যে কিছু করতে হয়, তা আমাদের অভিভাবক সমাজ বোধহয় অনুভবে আনতে পারছে না।

এমন পরিস্থিতিতে আমরা যারা নবীন লেখক হিসেবে এবং এই জীবনের ঘাতপ্রতিঘাতের অভিজ্ঞতায় যারা নবীন তারা জাতির এই ধ্বংসমুখী স্রোতধারা ও পঙ্কিলতাকে অস্বীকার করতে চাচ্ছি আমাদের সাধ্যমত। এবং ভবিষ্যত আশা আকাঙ্খাকে বুকে রেখে উদ্যোগ নিয়েছি নতুন করে-নতুন পথের সুবৃহৎ নির্মাণের এই কর্মযজ্ঞে আমরা গুটিকয়েক রয়েছি..

আমরা চাই এই ধারাকেএই উদ্যোগ প্রচেষ্টাকে সর্বত্র ছড়িয়ে দিতে। আমরা সমাজের পঙ্কিলতার অবসান চাই।

সকল সচেতন মহলের সহযোগিতায় আমাদের সামনে চলা বন্ধুর পথ আমরা পাড়ি দেবো এই প্রত্যাশা রাখি।

আজকের এই অনুষ্ঠান যুবসমাজকে পঙ্কিলতার পথ থেকে সমাজগঠনের দায়িত্ববোধ জাগাবে এই আশা রাখি।

সবাইকে ধন্যবাদ

১৬জুন, ২০০১

পানখাইয়া পাড়া

মারমা উন্নয়ন সংসদ দ্বিতীয় তলা উন্মুক্ত হল রুম(তখনো দ্বোতলায় দেয়াল ঘেরা দেয়া হয়নি)

 

Advertisement