এই পোস্টটি ১,৫৪৩ বার পড়া হয়েছে


আজ কীভাবে লিখি শুধু নিজের কথা?!

এ আমার মনের বেদনা!  এ আমার জীবনপাতার চিকিচিক ব্যাকুলতা!

তারিখ: ০৬ আগস্ট, ২০১৩

সময়: রাত ৮.৫০ টা

আজ কীভাবে লিখি শুধু  নিজের কথা?! নিজের উপর সেনা নির্যাতনের কথা আমি কীভাবে লিখি? স্বার্থপরের মতো কীভাবে বলে যাবো শুধু নিজের জন্য?

BurnedRice

তুমি জানবে না দুঃখ কাকে বলে!

ধানের গোলা পুড়ে গেলে কষ্ট কাকে বলে তুমি কী করে জানবে?

একটি  ছবি আমাকে আজ ভারাক্রান্ত করেছে। আকুল করেছে। ভাবিয়েছে, তবে কাঁদায়নি। কিন্তু মন থেকে অশ্রু ঝরতে চেয়েছে। চোখের কোণে উদাস বেদনা মনের অজান্তে জমা হয়ে আছে এখনো।

আজ ফেসবুকে যে ছবিটি আমাকে এত ভারাক্রান্ত করলো সেই ছবিটি এত তেমন বা বিশেষ তেমন কোনো ছবি নয়! এই  ছবিতে কেউ কাঁদেনি। হাহাকারও করেনি কেউ। বা চিৎকার করে বুকফাটা আর্তনাদও করেনি কেউ!

কিন্তু সেই ছবিই আমাকে আজ ভারাক্রান্ত করলো।

আজ ০৬ আগস্ট। ২০০৪ সালের এই দিনে আমি যখন পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের সভাপতি ছিলাম। খাগড়াছড়ির এক সমাবেশ থেকে এই দেশেরই সেনাবাহিনী আমাকে ধরে নিয়ে গিয়েছিলো। ধরে নিয়ে গিয়েছিলো আরো ৬ জনকে। ধরে সেনা ক্যাম্পে নিয়ে যাবার পরে রাতে আমাদের উপর চলেছিলো নির্মম নির্যাতন। আমাকে শুইয়ে রেখে আমার পায়েয় পাতায় হকিসস্টিকের বাড়ি পড়েছিল। আমি চিৎকার করে ব্যথার থেকে মুক্তি চেয়েছিলাম। আমি “ও মা. ও হদা(ও মাগো, ও ভগবান) না বলে বলেছিলাম “আজু ও আজু(ও দাদু ও আমার দাদু)। আমাকে যখন পেটানো হচ্ছিলো, আমি তখন আমার জন্মদাতা পিতাকে স্মরণ করিনি। কারণ আমি তাকে হারিয়েছি আমার ছোটোকালে। আমি মানুষ  হয়েছি দাদুর হাতে। দাদু আমাকে লেখাপড়া শিখিয়েছে, মানুষ করতে চেয়েছে। তাই তীব্র যন্ত্রণাকে বুকে চেপে তাকে স্মরণ করেছি।

আজ সেই স্মৃতির কথা আমার লিখতে বসার কথা ছিলো। কিন্তু সত্য বলছি, আমার আজ সেই মুড নেই। আজ আমি একি ছবি দেখলাম! আমি দেখলাম আমার দাদুরই বয়সী (বাবা হলেও বা ক্ষতি কি!)এক বৃদ্ধ তাঁর পুড়ে যাওয়া ধান হাতে ধরে দেখছে। তাঁর মেঁরুদন্ড ডেবে গেছে, তিনি কুঁজো হয়ে পরেছেন। তিনি নিচু করে তার পুড়ে যাওয়া ধান হাতে ধরে আছেন। তিনি কাঁদছেন না। তিনি চিৎকার করেন নি। তিনি কি হা হুতাশ করেছেন? হ্যাঁ, করতেও পারেন! তিনি হয়তো নির্লিপ্ত ছিলেন না, তিনি নির্লিপ্ত থাকেন নি। তিনি হয়তো কপালকে দোষ দিয়েছেন বা শেষ সম্বল ও্ই বিধাতাকে বা ভগবানকে স্মরণ করেছেন!

 

 

আজ আমাকে এই সাদাসিধে ছবিটিই ভাবিয়ে তুললো। আমি কী লিখতে বসে কী লিখলাম! আমি আমার উপর, সামান্য এই মিঠুন চাকমা, যে কি না, অতি সাধারন এক জীবন মাত্র! আমি আজ এই মিঠুন চাকমার উপর অত্যাচারের কাহিনী লিখতে বসে কেন নিজেকে স্বার্থপর করে তুলবো?

 

আমি জানি, এই বৃদ্ধ, যে কি না আমার দাদুরই সমবয়সী ছিলো বা এখনো সে আমার দাদুই হয়তো হবে! সেই বৃদ্ধরা কতোবার যে ঘরপোড়া খেয়েছে! তারা যে কতোবার পালিয়ে বেঁচেছে! আমি জানি, এই পার্বত্য দুঃখী মানুষের অনেকে তার মাত্র কয়েক বছরের জীবনে এক এক জন ৮ বার/১০ বার/ ১২ বার নিজের ঘর পুড়ে যেতে দেখেছেন। তিনি তাঁর বাপ দাদার ভিটেমাটি দখলীকৃত হতে দেখেছেন। তিনি তারপরও শুধু তার শেষ সম্বল তার প্রাণ নিয়ে অন্য জায়গায়, আরো গহীনে, অরণ্যে চলে গিয়েছেন। তিনি সেখানে নতুন আবাস গড়েছেন। কিন্তু সেখান থেকেও হয়তো তাকে পালিয়ে যেতে হয়েছিলো। তার শেষ সম্বল ছিলো মাত্র তার ওই জীবনটি!

আমি জানি, আমাদের এই পার্বত্য জুম পাহাড়ি জনগণ প্রায়া সবাই কোনো না কোনো সময়ে সম্মখীন হয়েছেন ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক হামলার। তিনি বা তারা পালিয়ে বেঁচেছেন।

এবং লড়াকুরা প্রতিরোধ গড়েছে। তাও আমার জানা।

আজ আমি আর লিখবো না! আজ এই ছবি আমাকে মগজে ঢুকে গেলো। ধানের গোলা তার পুড়ে গেলো।

 

আমি জানি সে আবার তার ধানের গোলা ভরাবে! আমি জানি সে আশা দেখবে! আমি জানি সে ঘরবাড়ি বানাবে! তারপর আমি হয়তো এই আঁচ করতে পারি সে আবার তার ধানের গোলা পুড়ে যেতে দেখবে! সে হয়তো দেখবে অনেক কষ্টে দুঃখে তিলতিল করে সঞ্চয় করা অর্থ দিয়ে তোলা তার ঘর বা বাড়ি আবার পুড়ে যেতে দেখবে! আমি জানি হয়তো তার গ্রাম আবার পুড়ে যাবে!

 

এবং আমি জানি আবার প্রতিরোধ হবে।

আজ আমি ভারাক্রান্ত, চোখের কোণে মনের বেদনা ভর করেছে আজ!

 

 

Advertisement