এই পোস্টটি ১৯৯ বার পড়া হয়েছে


সমাজতান্ত্রিক চিলি গঠনের আন্দোলনের নেতা সালভাদর আলেন্দে

দক্ষিণ আমেরিকার একটি দেশের নাম চিলি। প্রশান্ত মহাসাগরের তীর ঘেঁষে লম্বা করে দেশটি উত্তর-দক্ষিণ দিকে বিস্তৃত। সম্ভবত দেশটির মানচিত্র লম্বা বাঁকানো মরিচের মতো বলে দেশটির নাম হয়েছে ‘চিলি’, চিলি মানে ইংরেজি ভাষায় মরিচ।
এই দেশের ২৯তম প্রেসিডেন্টের নাম সালভাদর আলেন্দে। পুরো নাম সালভাদর গিলারমো আলেন্দে গোসেনেস (Salvador Guillermo Allende Gessens)। জন্মঃ ১৯০৮ সালের ২৬ জুন চিলির শান্তিয়াগো শহরে। মৃত্যুঃ আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের ষড়যন্ত্রের ফলে সামরিক ক্যুদেতা’য় ১১ সেপ্টেম্বর,১৯৭৩। মৃত্যুর সময় বয়স ৬৫ বছর।

allende
স্ত্রীর নাম হরতেনসিয়া বাস্সি(Hortensia Bussi). সন্তান সংখ্যা ৩।
তিনি চিলি দেশকে সমাজতান্ত্রিক ধাঁচে রূপান্তরের চেষ্টার জন্য দেশে ও পৃথিবীতে পরিচিত।
ছাত্র থাকাকালে তিনি একজন ফুটবল খেলোয়াড় ছিলেন। লংজাম্পে নাম করেছিলেন।
তাঁর রাজনৈতিক জীবনের ব্যাপ্তিকাল প্রায় ৪০ বছরের মতো। তারমধ্যে পার্লামেন্টারি সদস্য, মন্ত্রী ও প্রেসিডেন্ট হিসেবে ২৪ বছর যাবৎ রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন।

কিন্তু তিনি তাঁর সুদীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের মাত্র তিনবছরকালের প্রেসিডেন্ট জীবনে তাঁর চিলি দেশকে সমাজতান্ত্রিক ধাঁচের রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রবর্তনের চেষ্টার জন্য তিনি দেশ ও পৃথিবীতে পরিচিত হয়ে আছেন।
১৯৭০ সালের ৪ নভেম্বর তিনি চিলরি প্রেসিডেন্ট হন।
প্রেসিডেন্ট হবার আগের সংক্ষিপ্ত রাজনৈতিক জীবনী
১৯৩৩ সালের তিনি চিলি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডাক্তারি ডিগ্রি নেন এবং একজন শরীরতত্ত্ববিদ হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন।
১৯৩৩ সালে সোশ্যালিস্ট পার্টি অব চিলি গঠিত হলে তিনি ভালপারিসো এলাকায় পার্টির ভিত্তি মজবুত করার কাজে হাত দেন। তিনি সেখানে চিকিৎসা সুবিধার দাবিতে কাজ করেন। ১৯৩৮ সালে পার্টি পপুলার ফ্রন্ট নামে যৌথ আন্দোলনের সাথে যুক্ত হয়। পপুলার ফ্রন্টের শ্লোগান ছিলো ‘রুটি, একটি ছাদ ও কাজের নিশ্চয়তা’। পপুলার ফ্রন্ট সরকার গঠন করলে তিনি স্বাস্থ্যমন্ত্রীর পদ লাভ করেন।
১৯৫২, ১৯৫৮ ও ১৯৬৪ সালে তিনি তিন তিন বার চিলির প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে দাঁড়িয়ে পরাজয় বরণ করেন।
১৯৭০ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন
তিনি ’পপুলার ইউনিটি নামক কোয়ালিশনের প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে দাঁড়ান। এবার তাকে চিলি’র কম্যুনিস্ট পার্টিও সমর্থন করে। ১৯৭০ সালের ৪ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত নির্বাচনে তিনজন প্রার্থীর মধ্যে তিনি বেশি ভোট পান। তবে সংবিধান অনুযায়ী মূল প্রতিদ্বন্দ্বী দুই প্রার্থীর মধ্যে আবার কংগ্রেসের সদস্যগণ সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে যাকে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন করেন তিনিই প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হতে পারেন। এরই মধ্যে সামরিক বাহিনীর মধ্যে অভ্যুত্থান হয়ে যায়। সেনাপ্রধা্ন নিহত হন। মার্কিন গুপ্তচর সংস্থা সিআইএ’র এর পেছনে হাত ছিলো বলা হয়ে থাকে। কার্লোস প্রাটস নামে একজন জেনারেল সেনাপ্রধান মনোনীত হন।
২৪ অক্টোবর কংগ্রেস আলেন্দেকে প্রেসিডেন্ট হিসেবে ভোটাধিক্যে নির্বাচিত করে। এতে ডানপন্থী ক্রিশ্চিয়া ডেমোক্রেট সদস্যরাও আলেন্দেকে ভোট দেয়।
১৯৭০ সালের ৩ নভেম্বর তিনি চিলি’র প্রেসিডেন্ট হন।
সোশ্যালিজম চিলি’র নিজস্ব পথ
চিলি’র প্রেসিডেন্ট হবার পরপরই তিনি ঘোষনা করলেন- The Chilean Path To Socialism. চিলি’র নিজস্ব পন্থায় সমাজতন্ত্র’ বা সমাজতান্ত্রিক দেশ গঠনের আন্দোলনের ঘোষনা তিনি দিলেন। এবং তিনি শুধু ডাক দিয়েই ক্ষান্ত থাকলেন না। তিনি উৎসাহের সাথে কাজে নেমে পড়লেন।
বৃহৎ আকারের শিল্প জাতীয়করণ বা রাষ্ট্রীয়করণ
তিনি কপার খনি ও ব্যাংক খাতসহ বিভিন্ন বড় বড় শিল্প ও শিল্প কারখানা জাতীয় করণের ঘোষনা দিলেন। তিনি স্বাস্থ্য সেবা ও শিক্ষাখাতের ব্যাপক উন্নয়ন ঘটানোর চেষ্টা করলেন।
বিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রী ৭ থেকে ১৪ বছর বয়সের শিশুদের জন্য তিনি বিনা খরচে দুধ বিতরণের কাজে হাত দিলেন।স্কুলে ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য দুপুরের খাবারের ব্যবস্থা করলেন।শিক্ষার হার বাড়ানোর জন্য কাজ শুরু করলেন।
ট্যুইশন ফ্রি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার ব্যবস্থা করলেন। তিন বছরের মধ্যে ভর্তির হার বেড়ে গেল ৮৯ শতাংশ।
শহরাঞ্চলে গৃহহীনদের জন্য ঘর তুলে দেবার উদ্যোগ নিলেন। শ্রমিকরা বেতন ভাতা যেন ন্যায্য পরিমাণে পায় তার উদ্যোগ নিলেন।
আগে থেকেই জমি অধিগ্রহণ ও জমি পুনঃবন্টনের যে কাজ চলছিল তিনি তা আরো দ্রুততার সাথে করার উদ্যোগ নিলেন। ১৮ মাসের মধ্যে লাথিফুন্দা বা বৃহদাকারের কৃষি জমিদারী দেশের মধ্যে আর থাকলো না।
বিদ্যুতের দাম তিনি কমিয়ে দিলেন। তিনি বিভিন্ন খাতের ট্যাক্স কমিয়ে দিলেন।
তিনি পপুলার সংস্কৃতিকে পৃষ্ঠপোষকতা দিলেন।
নারীদের মাতৃত্ব ছুটি ৬ সপ্তাহ থেকে বাড়িয়ে ১২ সপ্তাহ করলেন।
প্রজেক্ট সাইবারসিন(Cybersen) একটি উন্নত নেটওয়ার্কৃ ব্যবস্থা তিনি সৃষ্টি করলেন। যার মাধ্যমে কলকারখানা থেকে টেলেক্স মেশিন ও কম্পিউটারের সাহায্যে সরকারের সরাসরি যোগাযোগ করার ব্যবস্থা করা হলো।
চিলি দেশের মধ্যে এই সকল সংস্কারমূলক কাজ শুধু কথার কথা ছিলো না। বাস্তবেই সাধারণ জনগণ এই সংস্কারের সুফল ভোগ করতে সক্ষম হচ্ছিলো।
একইসাথে পূঁজিপতিরা এই সংস্কার কাজে জর্জৃরিত হচ্ছিলো।
এরইমধ্যে আমেরিকান সরকার চিলি’র সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থা গঠনের কাজকে নানাভাবে ভন্ডু করার চেষ্টা করে যাচ্ছে। তার প্রতিক্রিয়া হিসেবে চিলি ঘোষনা দিলো আন্তর্জাতিক কোনো সংস্থা ও বিদেশী কোনো দেশের দেনা চিলি শোধ করবে না।
চিলি’র সমাজতান্ত্রিক সরকারকে উৎখাত করার চক্রান্ত সমানতালে চলতে থাকলো।
আলেন্দে যেদিন থেকে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে দাঁড়িছিলেন সেদিন থেকে তার বিরুদ্ধে আমেরিকা নানা চক্রান্ত ষড়যন্ত্রের জাল বিছাতে থাকে। আমেরিকার ন্যাশনাল সিকিউরিটি আরকাইভস-র ডকুমেন্ট থেকে জানা যায়, ১৯৭০ সালেই সিআইএ বলেছিল যে, আলেন্দে সামরিক অভ্যুত্থানে মারা যাবে।
সেখানে বলা হয়, ’এটা নিশ্চিত এবং অবধারিত বিধান যে, আলেন্দেকে ক্যু’র মাধ্যমে সরিয়ে দেয়া হবে.. …’
In 1970, the CIA’s deputy director of plans wrote in a secret memo: “It is firm and continuing policy that Allende be overthrown by a coup. … It is imperative that these actions be implemented clandestinely and securely so that the USG [the U.S. government] and American hand be well hidden.” ‍তথ্যসূত্র: তথ্যসূত্র
একই বছরে আমেরিকান তৎকালীন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন সিআইএকে নির্দেশ দিলেন, ‘”make the economy scream”। চিলি’র অর্থনীতিতে হাহাকার এনে দাও!
শাসনতান্ত্রিক সংকট শুরু করা হলো নানা ওজর উছিলা সৃষ্টি করে।
সাল ১৯৭৩, ১১ সেপ্টেম্বর। আলেন্দে রেডিওতে সরাসরি বক্তব্য দিচ্ছেন। এদিকে দূর থেকে শোনা যাচ্ছে গোলাগুলির আওয়াজ।
এরই মধ্যে তিনি বললেন,-
আমার দেশের প্রিয় শ্রমিক জনতা!
চিলি’র জনগণ ও তাদের আকাংখার উপর আমার বিশ্বাস আছে। বিশ্বাসঘাতকতা’র ভেতর থেকেও নিশ্চয়ই আগামীর যারা আসবে তারা এই অন্ধকার-অসহ্য সময়কে পরাজিত করতে পারবে।
মনে রাখবেন, দিনক্ষণ সমাগত, বিরাট সম্ভাবনার দুয়ার খুলে যাবে, যার মাধ্যমে মুক্ত জনতা নতুন একটি ভালো সমাজ গঠনের কাজে এগিয়ে আসবে।
চির জাগরূক থাকুক চিলি!
চির দেদিপ্যমান থাকুকি জনতা!
চিরজীবন বেঁচে থাকুক শ্রমিকসমাজ!

তিনি এই বক্তব্য শেষ করার কিছুক্ষণের মধ্যে ক্ষমতা দখলকারীরা ঘোষনা দিলো, আলেন্দে আত্মহত্যা করেছেন।
১৯৭৩ সালের ১১ সেপ্টেম্বর সালভাদর আলেন্দে’র মৃত্যু হলো।

চিলি’র সমাজতান্ত্রিক রূপান্তরের সংস্কারমূলক প্রচেষ্টা আপাতত থেকে গেল। কিন্তু রয়ে গেল চিলিকে আমূল পরিবরতনের শ্রমসাধ্য চেষ্টার বিরাট এক দক্ষযজ্ঞের অসমাপ্ত অধ্যায়ের অশেষ কর্তব্য কর্ম।

Advertisement