এই পোস্টটি ৪১৩ বার পড়া হয়েছে


এম এন লারমা পার্বত্য চট্টগ্রামের অগ্রগামী লড়াইয়ের পুরোধা পুরুষ, অনন্য এক ব্যক্তিত্ব

 ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৩। আজ পার্বত্য চট্টগ্রামের সংগ্রামী ইতিহাসের প্রধান এবং অনন্যতম লড়াকু নেতা শহীদ এম এন লারমার জন্মদিন। আজ তার ৭৪ তম জন্মদিন।

 

এই দিনে তাকে স্মরণ করি। তাকে নিয়ে যে লেখাটি লিখেছিলাম তা আজ শেয়ার করলাম।

 

ধন্যবাদ-

MNLArmaPhotocourtesy-MontinaDewan

সকল নেতৃত্বের কিছু না কিছু সীমাবদ্ধতা থাকতে পারে, এম এন লারমারও থাকতে পারে। তবে পার্বত্য জুম্ম জনগণ তাঁর নেতৃত্বেই প্রথম সংগঠিত হয়েছিল, লড়াই করেছিল প্রাণপন। তাঁকে জানাই লাল সালাম। তাঁকে “আইকনাইজড” করার প্রয়োজন মনে করিনা, যাতে মনে হতে পারে তিনি শুধু ‘দেবতাতূল্য’ ‘ তাঁর বিকল্প কেউই হবেনা। আমাদের প্রয়োজন তাঁর কর্ম থেকে শিক্ষা নেয়ার, তাঁকে অনুসরণ করার। তাঁর যদি কোনো ভুল থাকে তা শুধরে নিজেকে জাতির প্রয়োজনে গড়ে তোলার কাজ করে যাওয়াটাই আজ সবচেয়ে প্রয়োজনীয় করণীয়। 

এম এন লারমার সংক্ষিপ্ত জীবনী নিচে তুলে ধরলাম-

এম  এন লারমা। জন্ম ১৯৩৯ সালে ১৫ সেপ্টেম্বর পার্বত্য রাঙামটি জেলার নান্যাচর থানাধীন মাওরুম নামে এক গ্রামে। তাঁর ডাক নাম মঞ্জু। পার্টিতে যুক্ত হয়ে তাকে ডাকা হতে  ‘প্রবাহণ’ নামে। তার পিতার নাম চিত্ত কিশোর চাকমা। মায়ের নাম সুভাষিনী দেওয়ান।

১৯৫৮ সালে তিনি রাঙামাটি সরকারী উচ্চ বিদ্যালয় থেকে  ম্যাট্রিকুলেশন সার্টিফিকেট অর্জন করেন। ১৯৬০ সালে চট্টগ্রাম গভমেন্ট কলেজ থেকে এইচ এস সি পাশ করেন।

১৯৫৭ সালে পার্বত্য জুম্ম ছাত্রদের একটি সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সেই সম্মেলন সফল করতে তিনি গুরুত্বপূর্ন ভুমিকা পালন করেন।

ছাত্রাবস্থায় চট্টগ্রামে অবস্থান করার সময় তিনি  ১৯৫৮ সালে তিনি পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের সাথে সম্পৃক্ত হন এবং লড়াইয়ে সক্রিয় অংশ নেন।

 

১৯৬০ সালে তৎকালীন পাকিস্তান সরকার পার্বত্য চট্টগ্রামে কাপ্তাই বাঁধ নির্মানের উদ্যোগ নেয়। কাপ্তাই বাঁধ তৈরী করা হলে হাজার হাজার জুম্ জনগণ উদ্বাস্তু হবে এবং তারা তাদের ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদ হবে। এই বিষয়টি বুঝতে পেরে তিনি এই  কাপ্তাই বাঁধ গঠনের বিরোধীতা করার উদ্যোগ নেন। তিনি “কাপ্তাই বাঁধ পাহাড়িদের মরণ ফাঁদ”  এই শ্লোগান সম্বলিত একটি লিফলেট প্রকাশ করে  কাপ্তাই বাঁধ গঠনের বিরোধীতা করেন।

সরকার এ কারণে তাকে কারারুদ্ধ করে রাখে। ১৯৬৩ সালের ১০ ফেব্রুয়ারী হতে ১৯৬৫ সালের ৮ মার্চ পর্যন্ত তিনি কারান্তরীন থাকেন। পার্বত্য জুম্ম আন্দোলনের ইতিহাসে তিনিই প্রথম ব্যক্তিত্ব যিনি জুম্ম জনগণের সার্বিক কল্যাণ ও মঙ্গলের জন্য সরকারের রোষানলের শিকার হন এবং কারাবরণ করেন।

১৯৬৫ সালে তিনি জেলে থেকে বিএ পরীক্ষা দেন এবং বিএ পাশ করেন।

এরপর তিনি ১৯৬৬ সালে দিঘীনালা উচ্চ বিদ্যালয়ে কিছুদিন সহকারী শিক্ষক হিসেবেশিক্ষকতা করেন।

পরে চট্টগ্রাম রেলওয়ে কলোনী উচ্চ বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক হিসেবে  ১৯৬৮ সালের দিকে কিছুদিন চাকুরী করেন।

১৯৬৮ সালে বিএড ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৬৯ সালে এলএলবি পাশ করেন  এবং চট্টগ্রাম বার এসোসিয়েশনে যুক্ত হয়ে আইন পেশায় নিজেকে নিয়োজিত করেন।

 

১৯৭০ সালের প্রাদেশিক নির্বাচনে তিনি আইন পরিষদের সদস্য হিসেবে উত্তর পার্বত্য চট্টগ্রাম আসন থেকে বিপুল ভোটে নির্বাচনে জয়লাভ করেন।

এরপর ১৯৭১ সালের মার্চ থেকে স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হয়। সে সময় তিনি কোনো রাজনৈতিক কার্যকলাপে নিজেকে যুক্ত না করে চুপচাপ বা নিষ্ক্রিয় অবস্থায় জীবন যাপন করেন।

১৯৭২ সালে তার নেতৃত্বে তৎকালীন সরকার প্রধান শেখ মুজিবের কাছে পার্বত্য চট্টগ্রামের জন্য বিশেষ শাসনব্যবস্থার দাবি জানিয়ে  তিনি ৪ দফা দাবিনামা পেশ করেন। কিন্তু শেখ মুজিবুর রহমান এই দাবিনামার প্রতি ইতিবাচক সায় প্রদান না করে উল্টো প্রতিনিধি টীমকে এককথায় অপমান করেন। এতে এমএন লারমা বুঝতে পারেন পার্বত্য জুম্ম জনগণ এই শাসকগোষ্ঠীর কাছ থেকে কোনো অধিকার পাবে না। তাই পরে তিনি ঢাকা থেকে ফিরে ‘জন সংহতি সমিতি’ গঠনের উদ্যোগ নেন। এ সময় তিনি জুম্ম জনগণের নিজস্ব অস্তু শক্তিসম্পন্ন সশস্ত্র সংগঠনের প্রয়োজনীয়তাও অনুভব করেন। এবং গোপনে ‘গণ মুক্তি ফৌজ’ নামে একটি সশস্ত্র সংগঠনও দাঁড় করান। এই সংগঠন ও তার কার্যকলাপ পার্বত্য জুম্ম জনগণের কাছে এত জনপ্রিয়তা লাভ করে যে জনগণ এই সংগঠনকে ভালবেসে “শান্দিবাইনি” বা বাংলায় “শান্তি বাহিনী” নাম বসিয়ে দেয়। সংগঠনটি প্রতিষ্ঠার পরে পাবত্য চট্টগ্রামের  ‘ডাকাত দল’গুলোকে দমন করে, এছাড়া শান্দিবাইনি/শান্তিবাহিনী গ্রামে স্কুল প্রতিষ্ঠা করেছিল এবং এলাকার শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষায় ভূমিকা রেখেছিল।

১৯৭৩ সালের ৭ মার্চ সদ্য প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা সেই নির্বাচনে পার্বত্য চট্টগ্রাম আসন থেকে এসেম্ব্লি মেম্বার নির্বাচিত হন। এরপরে তিনি শেখ মুজিবের প্রতিষ্ঠিত ‘বাকশাল’এ যোগ দেন।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট শেখ মুজিব নিহত হলে এমএন লারমা আত্মগোপনে যেতে বাধ্য হন। পরে তিনি আত্মগোপনে থেকে সশস্ত্র লড়াই শুরু করেন।

১৯৭৬ সালে শান্তিবাহিনী সরকারের বিরুদ্ধে প্রথম সশস্ত্র আক্রমণ পরিচালনা করে।

 

১৯৮২ সালের ২৪ থেকে ২৭ সেপ্টেম্বর এমএন লারমা প্রতিষ্ঠিত জেএসএস এর কংগ্রেস অনুষ্ঠিত হয়। এই কংগ্রেসে সংগ্রামের লাইন নিয়ে নেতৃত্ব দুটি ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে।

এমএন লারমা “রণনীতিগতভাবে দীর্ঘস্থায়ী সংগ্রাম ও রণকৌশলগতভাবে দ্রুত নিষ্পত্তির লড়াই” এই তত্ত্ব প্রদান করেন। তার বিপরীতে প্রীতি কুমারের নেতৃত্বাধীন গ্রুপ “রণনীতিগতভাবে দ্রুতণিস্পত্তি”র তত্ত্ব উপস্থাপন করেন।এ গ্রুপটি ‘বৈদেশিক সাহায্য নির্ভর নীতি’ অনুসরণ করে পরদেশের সহযোগিতায় পার্বত্য চট্টগ্রামে অধিকার প্রতিষ্ঠার কথা উত্থাপর করেছিল।

এই  দুই ধারার মধ্যে বিরোধ ‘আলোচনা-সমালোচনা’ পদ্ধতিতে মীমাংসিত না হয়ে তা সশস্ত্র সংঘাতে রূপ নেয়।

১৯৮৩ সালের ১০ নভেম্বর তিনি এমএন লারমা উক্ত গ্রপ দ্বারা হামলার শিকার হন। এবং তিনি শহীদ হন। তার সাথে আরো ৮ জন শহীদ হয়েছিলেন।

Advertisement