এই পোস্টটি ২৮৭ বার পড়া হয়েছে


দাবিনামা বা কর্মসূচি গ্রহণ বিষয়ে আমার কিছু মূল্যায়ন

প্রারম্ভিক প্রয়োজনীয় উদ্ধৃতি:

কোনো নির্দিষ্ট যুদ্ধে একটি সেনাবাহিনী জয়ী হয় আর অপরটি পরাজিত হয়; বিজয় ও পরাজয়- উভয়টিই নির্ধারিত হয় অভ্যন্তরীণ কারণ দ্বারা। একটি যে বিজয়ী হয় তার কারণ, হয় তা শক্তিশালী , না-হয় তার সেনাপরিচালনা হলো যোগ্যতাসম্পন্ন, অন্যটি যে পরাজিত হয় তার কারণ, হয় তা দুর্বল, না-হয় তার সেনাপরিচালনা হলো অযোগ্য। অভ্যন্তরীণ কারণের মধ্য দিয়েই  বহিঃস্থ কারণগুলো কার্যকর হয়।

 

সূত্র: অনুশীলন সম্পর্কে- দ্বন্দ্ব সম্পর্কে; মাও সেতুঙ।

 

 

[ দাবিনামা বা কর্মসূচি ঘোষনা বিষয়ে এখানে আলোচনার সূত্রপাত করছি এ জন্যে যে, আমি দেখলাম, গত ১৪ সেপ্টেম্বর খাগড়াছড়িতে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্রছাত্রীরা একটি মানববন্ধন করেছে। তাদের দাবি হচ্ছে,

## পৌরসভা কর্তৃপক্ষ বাসস্টেশনের স্থান পরিবর্তন করে অন্য জায়গায় নিয়েছে। এতে তাদের ‘সাময়িক দুর্ভোগ’ পোহাতে হচ্ছে। তারা বাসস্টেশন আগের স্থানে আনার দাবি তুলেছে।

 

কিন্তু আমার ধারনা মতে শিক্ষার্থীদের এই দাবি এত বাস্তবসম্মত নয়! খাগড়াছড়ির রাজনৈতিক এবং সাম্প্রদায়িক সামাজিক পরিবেশ অনুযায়ী পৌরকর্তৃপক্ষ বাসস্টেশনের স্থান পরিবর্তন করার যে কাজটি করেছে তাতে আমার মতে বাস্তবে ভালো ফলই আনবে।

কেন?

 

ক) বাসস্টেশনগুলো এখন পাহাড়ি অধ্যুষিত এলাকায় স্থানান্তর হয়েছে। এতে কোনো সাম্প্রদায়িক ঘটনা ঘটলে তাতে বিভিন্ন দূরদূরান্ত থেকে আসা যাত্রীরা আকস্মিকভাবে বিপদগ্রস্ত কম হবে।

 

খ) এই পরিবর্তন খাগড়াছড়ি শহরের সম্প্রসারণকেই সহজ করে তুলবে।

 

(খাগড়াছড়ি বর্তমানে বর্ধিঞ্চু একটি শহর। এবং হয়তো আগামীতে ভারতের উত্তরপূর্বাঞ্চলের সাথে অর্থনৈতিক লেনদেন শুরু হলে এই শহর গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক কেন্দ্রে পরিণত হলেও হতে পারে!)

 

গ) সংশ্লিষ্ট এলাকার জনসাধারণ অর্থনৈতিকভাবে উপকৃত হতে পারবে। উক্ত এলাকায় ব্যবসা বাণিজ্যের সম্প্রসারণ হবে।

 

সেই সকলকিছু বিবেচনা করে আমি নিচে সংগঠনের দাবিনামা বা কর্মসূচি বিষয়ে আলোচনা করার চেষ্টা করেছি। এ বিষয়ে পূর্ণাঙ্গভাবে আলোচনা করতে আরো তথ্য উপাত্ত সংযোজন করা দরকার মনে করেছি। কিন্তু সীমিত পরিসরে নিচের আলোচনাটিই যথেষ্ট বলে বোধহয়।

]

 

 

২য় প্রয়োজনীয় উদ্ধৃতি:

 

যুদ্ধের ক্ষেত্রে আক্রমণ ও প্রতিরক্ষা, অগ্রাভিযান ও পশ্চাদপসারণ, বিজয় ও পরাজয় সবই হলো পারষ্পরিক দ্বন্দ্বাত্মক ব্যাপার। একটি ছাড়া অপরটি থাকতে পারে না। দুটি দিক একই সময়ে সংঘাতে লিপ্ত আবার পরষ্পর নির্ভরশীল, আর এটাই গঠন করেছে যুদ্ধের সামগ্রিকতা, যুদ্ধের বিকাশকে এটাই সামনে ঠেলে দেয় এবং যুদ্ধের সমস্যাবলীকে সমাধান করে।

 

সূত্র: অনুশীলণ সম্পর্কে দ্বন্দ্ব সম্পর্কে- মাও সেতুঙ।

 

 

দাবিনামা বা কর্মসূচি ঘোষনা বিষয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনা:

 

একটি সংগঠনের বা পার্টির দাবিনামা বা কর্মসূচি নিয়ে কথা বলা বা আলোচনা করা খুবই সাধারণ বিষয় বা তেমন জটিল কোনো বিষয় নয় বলেই মনে হতে পারে। কিন্তু, আসলে এই সাবজেক্টটি খুবই সিরিয়াস এবং ভীষণভাবে মাথা ঘামানোর মতোই।

 

কোনো নির্দিষ্ট সময়ের নির্দিষ্ট একটি দেশের বা অঞ্চলের বা জনগণের লড়াইয়ের ইতিহাসে যে সংগঠন, পার্টি বা সমষ্টি সুনির্দিষ্ট-স্পষ্টভাবে এবং সৃজনশীলভাবে দাবিনামা বা কর্মসূচি ঘোষনা করতে পেরেছে এবং সে অনুযায়ী সমষ্টিকে ঐক্যবদ্ধ করতে পেরেছে সেই সই সংগঠন, পার্টি বা সমষ্টিই কিন্তু লড়াইয়ে সফল হতে পেরেছে।

 

বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সংগ্রামের ইতিহাসে দেখা যায়, অনেক সংগঠন অধিকার আদায়ের স্বপক্ষে দাবিনামা বা কর্মসূচি ঘোষনা করে আন্দোলন শুরু করেছিলো। কিন্তু একমাত্র আওয়ামীলীগ প্রণীত ৬ দফা-ই জনগণের হৃদয়-তনুমন জয় করতে সক্ষম হয়েছিল। দাবিনামার সাথে তারা জনগণকে উদ্বেল করার মতো শ্লোগান “জয় বাংলা”কে তাদের লড়াইয়ের হাতিয়ার বানাতো পেরেছিল।

 

পৃথিবীর সফল লড়াই বা আন্দোলনগুলো নিয়ে পড়াশোনা করলেই দেখা যাবে, সুনির্দিষ্ট. সুস্পষ্টভাবে এবং জনতাকে উদ্বেলকারী দাবিনামা বা কর্মসূচি ঘোষনা করা এবং কাজ করার কারণেই লড়াইয়ে সফল হওয়া সম্ভব হয়েছে।

 

আমি পরে এ বিষয়ে আরো তথ্য ও উদাহরণ দিয়ে আলোচনা করতে পারবো আশা করছি। তবে আপাতত আমরা কর্মসূচি বা দাবিনামার কী কী বৈশিষ্ট্য থাকা প্রয়োজন তা নিয়ে কিছু সংক্ষিপ্ত আলোচনা করি।

 

এখানে একটি কথা বলা প্রয়োজন,কোনো পার্টি বা সংগঠনের যে কোনো লড়াই বা আন্দোলনের দাবিনামা বা কর্মসূচিকে যে সকল বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন হতে হয় তা হলো-

 

১. দাবিনামা বা কর্মসূচিকে হতে হবে সুনির্দিষ্ট এবং স্পষ্ট।

 

২. দাবিনামা বা কর্মসূচিকে হতে হবে জনতা বা সমষ্টিকে আকর্ষন করার মতো, তাদের হৃদয় উদ্বেলকারী।

 

৩. দাবিনামা বা কর্মসূচি এমন হবে যেন তা নিজের সংগঠন বা পার্টির লক্ষ্য-উদ্দেশ্য বা আদর্শের সাথে বিরোধ না ঘটায়। অর্থাৎ, এমন কোনো দাবি বা কর্মসূচি দেয়া যাবেনা যাতে পরবর্তীতে নিজেকেই বা নিজের সংগঠন বা পার্টিকেই পশ্চাদ্ভাবন বা উক্ত দাবিনামা শিকেয় তুলে দিতে হয়!

 

৩. কর্মসূচি বা দাবিনামাকে বাহুল্যবর্জিত হতে হবে।

 

৪. এমন কর্মসূচি বা দাবিনামা থাকবে যা আশুলক্ষ্যকে যেমন শক্তিশালী করবে তেমনি চূড়ান্ত লক্ষ্যকে এগিয়ে নেবে।

 

৪. আন্দোলন বা লড়াই হচ্ছে একটি প্রক্রিয়া(Process)। তাকে নিরন্তর বা ধারাবাহিকভাবে চালাতে হয়। সুতরাং, একে সেইভাবে ধাপে ধাপে এগিয়ে নিতে নেতৃত্বকে সজাগ থাকতে হয় এবং সেইভাবেই দাবিনামা ও কর্মসূচি প্রনয়ন করতে হয়।

 

৫. সর্বোপরি, কর্মসূচি গ্রহণ বা দাবিনামা ঘোষনা করে আন্দোলন করার লক্ষ্যই হচ্ছে জনগণ বা সুনির্দিষ্ট শ্রেনী বা সমষ্টিকে ঐক্যবদ্ধ করা। কিন্তু, শুধুমাত্র ঐক্যবদ্ধ করাই কি পার্টি বা সংগঠনের দায়িত্ব!? আসলে একটি সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যের দিকে বা অধিকার আদায়ের জন্যই জনগণ বা শ্রেনী বা সমষ্টিকে ঐক্যবদ্ধ করতে হয়।

 

তৃতীয় প্রয়োজনীয় উদ্ধৃতি:

 

একটি নতুন প্রক্রিয়ার উদ্ভবের অর্থ কি? পুরাতন ঐক্য আর যে দ্বন্দ্বাত্মক দিকগুলো নিয়ে তা গঠিত তদস্থলে আসে নোতুন ঐক্য আর তা গঠনকারী দ্বন্দ্বাত্মক দিকগুলো,যার ফলেই পুরাতন প্রক্রিয়াকে প্রতিস্থাপন করার জন্য উদ্ভূত হয় নোতুন প্রক্রিয়া। পুরাতন প্রক্রিয়ার ঘটে সমাপ্তি আর নোতুন প্রক্রিয়ার হয় সূচনা। নোতুন প্রক্রিয়া ধারণ করে নোতুন দ্বন্দ্ব এবং সূচনা করে দ্বন্দ্বের বিকাশের নোতুন ইতিহাস।

 

সূত্র: অনুশীলন সম্পর্কে দ্বন্দ্ব সম্পর্কে; মাও সেতুঙ।

Advertisement