এই পোস্টটি ৩৪৩ বার পড়া হয়েছে


মরণের প্রকারভেদ- সরোজ কান্তি চাকমা

সরোজ কান্তি চাকমা

বাত্ত্যা বৈদ্ধিয়্যা গুণে গুণে পঁচাশি বৎসর (তাহার প্রায়ই বলা তথ্য মতে) বাঁচিয়া অদ্য মরিল। মানুষের রচিত শাস্ত্রবিধি মতে এতক্ষণে যমালয়ে তাঁহার পাপ-পূণ্যের পাকা হিসাব কষা শেষ হইয়াছে। স্বর্গের সুশ্রী দেবতারা কিংবা নরকের কুশ্রী অত্যাচারী শুকরমুখো জীবগণ তাহার পুরষ্কার কিংবা শাস্তির কার্যকলাপ শুরু করিয়া দিয়াছেন। অবশ্য গ্রামের বয়ো-বিজ্ঞজনের ঐক্যমতে, বাত্ত্যার স্বর্গপ্রাপ্তি নি:সন্দেহ। কারণ, তাহার পঁচাশি বৎসর জীবন কালে সে কাহারও মনোকষ্টের কারণ হননি; ক্ষেত্রবিশেষে যদিও চাপাবাজিতে গুরু ছিলন।

শ্রুত কথা-যৌবন কালে কোন এক দ্রোণগুরুর আতিশষ্যে মহাসমারোহে নাকি কিছু তন্ত্র-মন্ত্র শিক্ষা করিয়াছিলেন; তাহাতে দুর্দশাগ্রস্থ যেরূপ মানুষের সেবা করিয়া গিয়াছেন ৯৯% লোককে সুষ্ঠ করিতে পারেন নাই বলিয়া সাধারণের মত। তাহার সম্পূর্ণ বিপরীত মত অবশ্য বাত্ত্যার ছিল।না পারিবার মধ্যে ছিল-তাঁহার দুই ছেলে ও তিন মেয়েকে যথারীতি, যথাক্রমে গোমূর্খ ও ছাগী-মুর্খ বানাইয়াছেন। সুপাত্র-কুপাত্রের জ্ঞান না রাখিয়া তাহার তিন মেয়ে যথা ইচ্ছা স্বয়ম্ভরিত হইয়া এখন বেশির ভাগ কষ্টে দিনাতিপাত করিতেছে বলিয়া জনশ্রুত। হতচ্ছাড়া, চুড়ান্ত বেআক্কেল তাহার দুই ছেলে গ্রামের ইহজনমে কোনক্ষণে কেহই বিবাহ করিবে না এইরূপ কদাকার পাত্রী মনো:পুত করিয়া খাইয়া না খাইয়া, বেলা-অবেলায় ঝগড়া করিয়া সংসারের আবর্জনার হেতু হইতেছে। যাহাই হউক, ইহা নিতান্তই বাড়তি কথা, কেবল কথার স্রোতে কথার কথা।

এই সেই অভাগা “বাত্ত্যা বৈদ্ধিয়া” কোন এক কালে, কোন এক হাট হইতে একটি নিলামী কোট ক্রয় করিয়া শীতকালীন বন্ধু বানাইয়াছেন যাহার বয়স হিসাব করিতে গেলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ কিংবা মুক্তিযুদ্ধের সন জানা থাকা আবশ্যক হইয়া পড়িবে। ক্রয় করা অবধি হইতে কোট মহাশয় কোনদিন পান নাই ইহা হলফ করিয়া যে কেউ ভগবানের নামে কসম করিতে পারিবে। কোট মহাশয়ের চোখ-মুখ যদি থাকিত তবে, ইহার জন্য তাহার হাসি-কান্নার আভাস পাওয়া যাইত বটে।

প্রতি বৎসর শীতকালে বাত্ত্যাকে জড়াইয়া ধরিয়া যেপ্রকার ওম বিতরণ করিয়াছেন তাহার প্রতি বাত্ত্যার কৃতজ্ঞতার ব্যত্যয় হইলে বাত্ত্যার অবশ্যই নরকবাস হইবে বলিয়া আমার মত। গ্রীষ্মকালটি ছিল কোটটির মহা দুর্যোগ কাল। ঘরের কোনায় অনাদরে ডুকরিয়া ডুকরিয়া অলস জীবন-যাপন করিতে হইত। কেবল তাহাই নহে, রাজ্যের নানাবিধ কীট-পতঙ্গের তাহাতে চলিত দলাদলি,রক্তারক্তি,প্রাণঘাতি রণকান্ড।কোটের পকেটগুলো ছিল কাঁকড়া বিছেদের বাসা,মধ্যাংশে ছিল তেলাপোকাদের ঘর-সংসার, হাতগুলোতে ছিল মাকড়সাদের কপিখানা।

তবে শীত সমাগত হইলে এই পতঙ্গের রাজ্যে পড়িত মহা হাহাকার। বাত্ত্যা খানিকটা ঝাড়িয়া-মুছিয়া গায়ে দিত যদিও ততক্ষণে অতি ধৈর্য্যশীল দু’য়েকটা কাকড়া বিছা পকেটে থাকিয়া যাইত। তবে ইহারা বাত্ত্যাকে কোনসময় উৎপাত কিংবা নাকে-মুখের প্রতি বিদ্বেষ ভাবাপন্ন হইয়াছে বলিয়া শুনা যায় নাই। এই অত্যারিত যখন দুর্যোগ কাল শুরু হইয়াছে ঠিক ততক্ষণে বাত্ত্যা মরিল। ঘরের কোনায় বসিয়া কোট মহাত্মা বাত্ত্যার জন্য হাসিল কি কাঁদিল কেহ বুঝিতে পারিল না। বাত্ত্যাকে শ্বশানে নিয়ে যাওয়ার সময় কোন এক বেরসিক লোক কোটটাকে তুলিয়া বাত্ত্যার শবাসনে তুলিয়া দিল। বাত্ত্যার সহমরণ যাত্রী হইয়া কোট্খানা আতঙ্কগ্রস্থ হইল নাকি প্রসন্নগ্রস্থ হইল বোঝা মুশকিল ছিল। চিতায় অগ্ন সংযোজিত হইয়া কেউ একবার চিন্তা করিল না যে, বাত্ত্যার মরণে স্বর্গ-নরকপ্রাপ্তি হইলেও নিরপরাধ কোটখানার যে শূন্যপ্রাপ্তি ঘটিবে। এই দু’রকম মৃত্যতে বাত্ত্যার প্রতি শোক থাকিল, কোটখানার প্রতি কারো ক্ষোভও থাকিল না। ( জীবনের স্মৃতি থেকে নেয়া)

Advertisement