এই পোস্টটি ৩৬৭ বার পড়া হয়েছে


শত্রুর দ্বারা আক্রান্ত হওয়া ভালো

  1. বেঁচে আছি এখনো
  2. ২ জুলাই দুপুরে গাড়িতে করে যাচ্ছিলাম এক জায়গায়। একজন ফোন করলো। জানালো, একজন তাকে ফোনে জানিয়েছে যে, টিভি স্ক্রলে আমার নাম, মানে মিঠুন চাকমা’র নাম দেখানো হচ্ছে। মিঠুন চাকমা গুলিতে নিহত হয়ে মারা গেছে, এই হচ্ছে টিভি স্ক্রলে দেখানো তথ্যের সারমর্ম। আমি বললাম, বেঁচে আছি তো এখনো! তবে মরতে আর কতোক্ষণ! 

    মুখে থুথু নিক্ষেপ 

    দুয়েকদিন ভালোমতে ফেসবুকে বসা হচ্ছে না। একজন আমাকে বললো, গুমেতকুল্যা ফেসবুক বন্ধু নাকি আমাকে স্মরণ করেছেন। সন্তু লারমার মুখে থুথু দেয়া নিয়ে তিনি আমাকে শাসিয়েছেন। তবে তাঁর লেখাটি আমি এখনো পড়ার সুযোগ পাইনি সময়ের অভাবের কারণে। 

    আসলে মুখে থুথু নিক্ষেপ বিষয়টি খুবই ভালগার ঠেকে আমার কাছে।

    তবে এ বিষয়ে যেহেতু আমি কথা বলেছি বলে মিডিয়ায় এসেছে, সেহেতু আমার কৈফিয়ত দেয়া প্রয়োজন বোধ করছি। 

    জাতির মান মর্যাদা যারা বিকিয়ে যারা দেয় বা যারা দালাল বা জাতি ও জনগণের শত্রু তাদের মুখে থুথু নিক্ষেপ করা এবং তাকে বা তাদের ঘৃনা করার সাহস ও চেতনা ছাত্র-যুবশক্তির থাকা প্রয়োজন এটা আমি মনেকরি এবং জোর দিয়ে বলার চেষ্টা করি। সন্তু লারমা যদি দালালি করে তবে তাকে ঘৃনা করা যেমন আমাদের প্রয়োজন, তেমনি মিঠুন চাকমা যেদিন আদর্শ বিসর্জন দেবে সেদিন তাকেও থুথু নিক্ষেপ করার মতো চেতনাসম্পন্ন মানুষ থাকা দরকার বলে আমি মনেকরি। ইউপিডিএফও যেদিন আদর্শ বিসর্জন দেবে, যেদিন তারা বিচ্যুত হবে মূল আদর্শ থেকে সেদিন থেকেই ইউপিডিএফএর নেতাকে ঘৃনা করা চেতনাসম্পন্ন ব্যক্তির কর্তব্য। 

    আমি যুব ফোরামের সম্মেলনে কী বলেছি তা নিচে তুলে ধরলাম- 

  3. ইউপিডিএফএর সংগঠক মিঠুন চাকমা বলেন, জনগনের আস্থা অর্জনের মাধ্যমেই আমরা রাজনৈতিক শক্তি সংহত করে লড়াইকে বেগবান করতে পারবো।

     

    তিনি আরো বলেন, ১৯৯৭ সালে পার্বত্য চুক্তি স্বাক্ষরের মাধ্যমে জনগনের শক্তিকে যেভাবে সন্তু লারমা সরকারের কাছে সমর্পন করেছেন তা লজ্জ্বাজনক। যারা জাতীয় অধিকার আদায়ের আন্দোলন সরকারের কাছে বিকিয়ে দিয়েছে তাদের মুখে থুথু নিক্ষেপ করার মতো জাতীয় অধিকার সচেতন ছাত্র-যুব-জনতার আজ খুবই প্রয়োজন। তাদেরকে বয়কট করা এবং শিক্ষা দেয়া আমাদের খুবই প্রয়োজন। কিন্তু আক্ষেপ এই যে, আমরা আজ দালাল-সুবিধাবাদের খপ্পরে পর্যুদস্ত।

  4. ব্যক্তিগতভাবে শুধু একজন ব্যক্তিকে উদ্দেশ্য করে বলার আমার কোনো খায়েশ নেই। এবং আমার উপরের এই বক্তব্য থেকে আমি একচুলও নড়তে রাজি নই। 

     

    মারা গেল আরো দুইজন 

    আজ আরো দুইজন মারা গেলো। কীইবা বলার আছে! 

     

    অবস্থাদৃষ্টে এখন মনে হচ্ছে আন্দোলনের লক্ষ্যকে সামনে রেখে আমরা কিছুই করছি না! যা করছি তা হচ্ছে, ক্রিয়া এবং পাল্টা প্রতিক্রিয়া মাত্র! 

    লড়াইয়ের লক্ষ্য এখন ঝাপসা হয়ে গেছে আমাদের লড়াইকামীদের কাছে!

    তারপরও বলি, আমাকে একজন শুভাকাঙ্খী ফোন করে বললেন, কী, মিঠুন! তোমরা তো অনেক ক্ষতিগ্রস্ত হলে! ফোনে আর কত বলবো! তাকে কিছু বললাম না। শুধু বললাম, সব কিছুই তো সহ্য করে যেতে হবে! দেখা যাক কী হয়! 

    শত্রুর দ্বারা আক্রান্ত হওয়া ভালো

    চীনের লড়াইয়ের কোনো এক সময়ে মাও সেতুঙ এই উপরের কথাটি বলেছিলেন। বর্তমানে যেভাবে পার্টির সদস্যরা মারা যাচ্ছে, তাতে আমার আবার এই উদ্ধৃতিটি স্মরণ করতে ইচ্ছে হচ্ছে! এক অর্থে সঠিকই যে, শত্রুর দ্বারা আক্রান্ত হওয়া ভালো! 

    ক্যানভাসকে শুধু ইউপিডিএফ-জেএসএস সংঘাত হিসেবে বিবেচনা করে আলোচনা করলে বলা যায়, আক্রান্ত হবার পরে কর্মী-নেতা-শুভাকাঙ্খীদের মাঝে তিনটি প্রতিক্রিয়া হয়- 

    ১. আরো বেশি বেপরোয়া বা প্রতিশোধমূলক ভূমিকা গ্রহণ করার কথা ভাবে।  

    ২. যারা ভীতু তারা পশ্চাদ্ধাবনের চিন্তা করে।অথবা শত্রুকে অভিসম্পাত দেবার জনূ মুখিয়ে ওঠে। 

    ৩. নিজেদের মূল্যায়ন করার চেষ্টা করে।  

     

    প্রথম এবং দ্বিতীয় বিষয় নিয়ে ভাবার অনেকেই থাকে। কিন্তু তৃতীয় বিষয়টি নিয়ে ভাবার জন্য খুবই কম মানুষ থাকে! তবে আন্দোলনকে সুনির্দিষ্টভাবে সঠিক পথে নিতে হলে এই তৃতীয় বিষয় নিয়েই ভাবতে হয় সবচেয়ে বেশি! সেই বিষয়টি মাথায় রেখেই বলছি, শত্রুর দ্বারা আক্রান্ত হওয়া ভালো। 

    শত্রু যদি আমাদের কিছুই করতে না পারতো বা আমরা যদি শুধু বিজয়ই অর্জন করতাম তবে আমাদের মাঝে আত্মম্ভরিতা পেয়ে বসতো, আমরা নিজেদের শ্রেষ্ঠ ভাবতে শুরু করতাম! শত্রু আমাদের ক্ষতি করতে পারছে দেখেই কিন্তু আমাদের নিজেদের নিয়েও ভাবতে হতে হচ্ছে। 

    আন্দোলনের বিপ্লবী বিধান মার্ক্সবাদের অন্যতম সূত্রই হচ্ছে- দ্বন্দ্বের বিষয়টি হচ্ছে অভ্যন্তরীন। বস্তুর অভ্যন্তরেই প্রথমে পরিবর্তন বা বিকাশ বা ক্ষয়ের শর্ত সৃষ্টি হয়। বস্তুর বাইরের বিষয়টি অনুঘটক অথবা প্রভাবক মাত্র! 

    আমরা সেই দৃষ্টিকোণ থেকেই যদি দেখি তবে, এই যে হামলা বা পাল্টা হামলার কারনে এই ক্ষতি তা যেদিক থেকেই হোক না কেন তাতে আগে মূল্যায়ন করতে হবে নিজের দিক থেকে। ‘শত্রু’কে অবশ্যই মূল্যায়ন করতে হবে, তবে আগে নিজেকে মূল্যায়ন করাটাই হচ্ছে গুরুত্বপূর্ণ। 

    এই হামলা বা পাল্টা হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় আমি দ্বিধাগ্র্ত হই না! তবে যখন এই বিষয়টিকে মূল্যায়নের সময় “দ্বন্দ্বের বিষয়টি হচ্ছে অভ্যন্তরীন”-এই গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক এবং দার্শনিক সত্যটিকে অনুধাবন করা না হয় তখনই বেশি করে দ্বিধাগ্রস্ত হতে হয়!  

    আমার এত বছরের লড়াই সংগ্রামে যা আমি দেখেছি বা শুনেছি তা হলো, প্রতিটি দুর্ঘটনা-মৃত্যু বা পরাজয় বা পশ্চাদ্ধাবনের পেছনে রয়েছে অসতর্কতা-শত্রুকে মূল্যায়ন না করা অথবা নিজের ভুল শোধরাতে না পারা ইত্যাদি। 

    শত্রু তার কাজ করবে। কিন্তু আক্রান্ত হবার পরে যদি বেপরোয়া প্রতিশোধ,ক্রোধ অথবা অভিসম্পাত বা পশ্চাদ্ধাবনের ভাব-বাসনা জেগে ওঠে। যদি মূল্যায়নের বা আত্মজিজ্ঞাসার ভাববোধ জেগে না ওঠে তবে তো মূল সমস্যাটি অর্থাৎ শত্রুকে বুঝতে না পারা এবং তাকে পরাজিত করতে না পারার সমস্যাটিই থেকে যাবে অংকুরে! 

    (উদাহরণটি খুবই ছোট! কিন্তু মর্মার্থ বিকট!)

     

    এখানে একটি উদাহরণ বলে রাখি, বন্ধুপ্রতিম সংগঠনের সহযোদ্ধা খুন হলেন কয়েকমাস আগে। খুন হবার পরপর তার লাশ সংগ্রহ করে তার প্রত সম্মান দেখানো বা পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানানো অথবা প্রতিবাদ বিক্ষোভ প্রদর্শনই মুখ্য দায়িত্ব হওয়া কর্তব্য বলেই বিবেচিত হওয়া উচিত। কিন্তু, একি! মারা যাবার দুয়েকঘন্টার মধ্যেই তার সহযোদ্ধাদের মনে পড়লো, ওমুকে বাসায় তো পার্টির একটি মটর সাইকেল রয়েছে! কয়েকজন কী করলো, সহযোদ্ধার স্ত্রীর সামনেই নিয়ে গেলো সেই মটরসাইকেল! সহযোদ্ধার স্ত্রীকে সমবেদনা জানানোর কথা তারা ভুলে গিয়ে দিয়ে গেলো এক অন্তহীন মর্মবেদনা! 

    এবং, এই-ই হচ্ছে সংগঠনের অভ্যন্তরীণ পচনের লক্ষণ! এবং তখনই এই পচন রোধ করার জন্য বাহ্যিক শত্রুর দিকে চোখ না রেখে চোখ দিতে হয় অভ্যন্তরীণ শত্রু আদর্শহীনতা-অন্যায়-বিশৃঙ্খলাকে কড়াভাবে নিক্তিতে মাপার দিকে! 

    ক্যানভাসকে বড় করে দেখলে 

    এবার ক্যানভাসকে পার্বত্য চট্টগ্রামের নিপীড়িত জনগণের অধিকার আদায়ের সংগ্রামের প্রেক্ষিত থেকে বিশ্লেষণ করলেও আমরা সেই একই সমস্যাসূত্র দ্বারা পরিচালিত হতে দেখবো! এই যে, ভ্রাতৃঘাতি দ্বন্দ্ব, এই দ্বন্দ্ব তাতো এক অর্থে শত্রুশক্তিরই কৌশলী খেলা! আমরা যদি এই ফাঁদে পা দিই, তবে আর শত্রুকে দোষারোপ করে লাভ কী! 

    আমাদের মধ্যে বস্তুর এই অভ্যন্তরীন পরিবর্তনের দিকেই খেয়াল আসবে এই প্রত্যাশা রইল।

Advertisement