এই পোস্টটি ৫১২ বার পড়া হয়েছে


বাংলাদেশে ক্ষুদ্র জাতিসমূহ ও জনগণের মধ্যে ঐক্য কেন জরুরী

 [ কৈফিয়ত: লেখাটি একটি প্রকাশনায় প্রদান করার জন্য লেখা হয়েছিল। কিন্তু নানা কারনে লেখাটি আর পাঠানো হয়নি। আজ মনে হলো লেখাটির মধ্যে নানা সীমাবদ্ধতা থাকার পরেও এর বিষয়বস্তু আরো অনেকের কাছে জানানো দরকার। তাই লেখাটিতে কোনো সংশোধন না করেই ব্লগে প্রকাশ করা হলো। ]

আজকে যে বাংলাদেশে আমরা বসবাস করছি ১৯৪৭ সালের পূর্বে তা বৃহৎ ভারতবর্ষেরই অন্তর্ভুক্ত ছিলো।দ্বি-জাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে ভারত পাকিস্তান নামে দুটো দেশ সৃষ্টি হবার পরে পাকিস্তানের অংশ হিসেবে আজকের বাংলাদেশ অঞ্চলটি পূর্ব পাকিস্তান নামে অন্তর্ভূক্ত হয়।

১৯৪৭ সালের জুলাই মাসে স্যার সিরিল র‌্যাডক্লীফ বর্ডার কমিশনের সভাপতিত্ব গ্রহণের পরে পুরো ভারতবর্ষকে দুটি আলাদা রাষ্ট্র হিসেবে গঠন করতে সীমান্ত ভাগাভাগির উদ্যোগ নেন।তিনি তাঁর ইচ্ছেমতন মানচিত্রে কাটাকুটি করে ভারত এবং পাকিস্তানের সৃষ্টি করেন।ধর্মের ভিত্তিতে এই দুটো দেশ সৃষ্টি হলো।মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চল পাকিস্তানের অধীন আর হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চল ভারতের অধীন করা হলো।তবে পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চল মুসলিম অধ্যুষিত না হবার পরেও তা পাকিস্তানের মানচিত্রে জুড়ে দেয়া হলো।বলা হয়ে থাকে পাঞ্জাবের ফিরোজপুর জেলা ভারতকে প্রদানের বিনিময়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম পাকিস্তানের ভাগে জুড়ে দেয়া হয়।

ধর্মের ভিত্তিতে যে দেশ দুটির সৃষ্টি হলো সে দেশের দু অঞ্চলেই যে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী হাজার বছর ধরে বসবাস করে আসছে তাদের কথা, তাদের আবাসভূমির কথা, তাদের পৃথক স্বকীয়তার কথা তৎকালীন বৃটিশ সরকার এবং ভারত পাকিস্তান বিভক্তকারী সুবিধাবাদী শাসকচক্র ভূলে গেলো। এরই ফলে জাতিসমূহ পৃথক দুটি দেশের অন্তর্ভূক্ত হয়ে গেলো।১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের মাধ্যমে পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে বাংলাদেশ রাষ্ট্র গঠন হলো।

দেখা গেল মুনিপুরী জাতিগোষ্ঠীর জনগণ ভারত ও বাংলাদেশ নামে দুটি দেশের মধ্যে ছড়িয়ে গেল। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বসবাসরত সান্তাল, গারো, খাসী সহ অনেক জাতির জনগণ পৃথক দুটি দেশের অধীন হলো। পার্বত্য চট্টগ্রামের চাকমা-মারমা-ত্রিপুরা-বোম জাতির জনগণও বিভক্ত হলো দুটো পৃথক দেশের মধ্যে। ভৌগোলিক-সামাজিক-সাংস্কৃতিক ঐক্য একটি জনগোষ্ঠীর বিকাশের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজণীয়। কিন্তু এই সকল জাতিসমূহ পৃথক দু অঞ্চলে বিভক্ত হবার কারণে তার আর সম্ভাবনা তেমন থাকলোনা। তবে রাষ্ট্রীক যে বাধা তা আত্মিক বন্ধনকে দূর করতে পারলোনা।এখনো সীমানার দেয়াল মাঝে মাঝে বোঝা হয়ে থাকলেও তা বারংবার মানা সম্ভব হয়না।বৃহৎ জাতির দ্বন্দ্ব-সংঘাতের বলি হলো ছোটো জাতিসমূহ। তারা পৃথক দেশের মধ্যে বিভক্ত হবার কারণে আজ তাদের মধ্যে ঐক্য সংহতি এখনো নাড়ির বন্ধনের আকারে থাকলেও কৃত্রিমতার তার বাধা হিসেবে থাকার কারনে অনেকসময় তা ম্রিয়মান রূপে ধরা দেয়।

যদিও এটাই সত্য যে কৃত্রিম সীমানা কোনোকালেই চীরস্থায়ী নয়। তারপরও এটাই বাস্তবতা যে আমরা ৪৫ টি বা তারও অধিক ক্ষুদ্র জাতিসত্তা ও আদি অধিবাসী জনগণ আজ বাংলাদেশ ভুখন্ডের বাসিন্দা। কিন্তু এই বাংলাদেশ রাষ্ট্র কি ক্ষুদ্র জাতিসমূ্হকে কাছে টেনে নিয়েছে?

দেশ পরিচালনার মৌল যে বিধান সেই বিধান হচ্ছে সংবিধান বা ইংরেজী ভাষায় কনস্টিস্টিউশন। সেই বিধানে তো জাতিসমূহকে স্বীকৃতি দেয়া হয়নি। ১৯৭২ সালের সংবিধানে দেশ পরিচালনার চারটি মৌল নীতিতে যুক্ত করা হয়েছিল বাঙালী জাতীয়তাবাদ-কে।পরে তা সংশোধন করা হয়। আনা হয় বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের নামে মুসলিম ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতাবাদকে। রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম ঘোষনা কর বাকি ধর্মসর্মহকে দ্বিতীয় শ্রেনীর করাহয়। ২০১১ সালের ৩০ জুন সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে তাড়াহুড়ো করে সংবিধান সংশোধন করে আবার ফিরিয়ে আনা হয় বাঙালী জাতীয়তাবাদকে।এখন সাংবিধানিকভাবে জাতি হিসেবে আমরা সবাই বাঙালী। কলমের এক খোঁচায় সংখ্যা ও বাহুবলের বলি হয়ে আমরা আজ জাতিগত পরিচয় হারিয়ে ফেলেছি।এটাই নির্মম এক বাস্তবতা আজ।

তবে এখনো আশাহত না হবার একটি কারন এ কারনে যে, এই জোর করে বাঙালী বানানোকে আমরা এবং এ দেশেরে সচেতন-জাগ্রত জনগণ এখনো মেনে নিতে পারেনি।

মেনে নিতে পারেনি বলেই যেদিন থেকে জাতিগত পরিচয় মুছে ফেলার চেষ্টা করা হচ্ছে সেদিন থেকেই চলছে তার বিরুদ্ধে বিক্ষোভ। হয়তো এখনো এই বিক্ষোভ অগণিত জনতার বজ্রধ্বনি আকারে বিষ্ফোরিত হয়নি।কারন ঐক্য এবং সংহতি এখনো হয়তো সুদৃঢ় করা যায়নি। কিন্তু দেশের বাঙালী ভিন্ন অন্যান্য জাতিসত্তার জনগন এটা উপলব্ধি করছে, যে দেশে আমরা বসবাস করছি সে দেশকে ভালোবেসে আমাদের এই চরম বাঙালী জাত্যাভিমানী শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে লড়াই করতে হবে। এবং এই লড়াই একা করলে জয় আসবেনা। এই লড়াই করতে হবে ঐক্যবদ্ধভাবে এবং সংগঠিত হয়ে।

 বর্তমানে ৪৫ টি জাতিসত্তা বা আদি অধিবাসী জনগোষ্ঠীর মাঝে হয়তো ঐক্য এখনো নেই তবে এটাই অবধারিত যে যদি আমরা অধিকার নিয়ে, মর্যাদা নিয়ে  বেচে থাকতে চাই তাহলে ঐক্য অনিবার্য।শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে আমাদের নানাভাবে নানা কৌশলে আমাদের ঐক্যের জোর দেখাতে হবে।আমাদের মধ্যে ঐক্য

ছিলো না বলেই সরকার এক কলমের খোচায় আমাদের জাতিগত পরিচয় লুকিয়ে দিতে পেরেছে। যদি আমাদের মধ্যে ঐক্য পূর্ব থেকেই সৃষ্টি হতো তবে সরকার জাতিগত পরিচয় মুছে ফেলার আগে চিন্তা করতো।

ঐক্য কীভাবে সম্ভব?

 

ঐক্যের প্রথম শর্তই হচ্ছে পারস্পরিক আস্থা-বিশ্বাস-মর্যাদা-সম্মান প্রদান।ভাগ কর এবং শাসন কর এই নীতির মাধ্যমেই শাসকগোষ্ঠী এখনো আমাদের পরাজিত করে রেখেছে।শাসক গোষ্ঠী ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে অনৈক্য নানাভাবে প্রতিষ্ঠা করে রেখেছে। তারা সমাজের মুষ্ঠিমেয় কয়েকজনকে নানা সুযোগ সুবিধা দিয়ে, তাদের দ্বারা আমাদেরকে দমিয়ে রাখার চেষ্টা করছে। অধিকার আদায়ের জন্য জোরদার লড়াই যাতে সৃষ্টি না হয় তার জন্য মেকি অধিকারকামী সৃষ্টি করে রাখা হয়। তাদের দ্বারা সময়ে-রুটিমাফিক নানা লোক দেখানো প্রোগ্রাম করানো হয়। এই সকল ভাঁওতাবাজির লড়াই দিয়ে প্রকৃত অধিকার অর্জন সম্ভব নয়। আমাদের মধ্যে  ঐক্য সৃষ্টি করতে হলে এই ভাঁওতাবাজির আন্দোলনকারীদের চিহ্নিত করা অবশ্যই গুরত্বপূর্ণ একটি দায়িত্ব।আমাদের মধ্যে প্রথমে এই আস্থা আনা প্রয়োজন যে আমরা যেমন একজনের অধিকারকে সম্মান দিই তেমনি অন্যের অধিকার নিয়েও আমাদের সোচ্চার হতে হবে। একজনের দুঃখের ভাগীদার আরেকজনকে নিতে হবে। যখনই কোথাও নির্যাতন সংঘটিত হবে তখনই তার বিরুদ্ধে সব জায়গায় সোচ্চার ভূমিকা আমরা নিতে পারি। এভাবেই আমাদের মধ্যে আস্থা যেমন অর্জন হবে তেমনি অন্যে প্রতি সহমর্মিতাও সৃষ্টি হবে।

ন্যূনতম কর্মসূচি ভিত্তিতে আমাদের একটি সংগঠনের পতাকাতলে কাজ করতে হবে। এখানে এটা মনে রাখা প্রয়োজন যে, সংগঠনই হচ্ছে ঐক্যবদ্ধ হবার ভিত্তি। সুতরাং আমাদের মতো ক্ষুদ্র জাতিসত্তাসমূহের অধিকার পেতে হলে দেশীয় প্রেক্ষিতে বৃহত্তর পর্যায়ে একটি কমন প্লাটফরম গঠন করা আজ সময়ের দাবি।কমন প্লাটফরম গঠনের জন্য আমাদের প্রয়াস চলছে।

সম্প্রতি ঢাকায় ঢাকায় এক কনভেনশনের মাধ্যমে গঠন করা হয়েছে ছোটো ছোটো জাতিসমূহের সংগঠন ‘জাতিসত্তা মুক্তি সংগ্রাম পরিষদ’। এই সংগঠনের রয়েছে লড়াকু আদর্শ। এই সংগঠন আন্দোলনের নামে ভাঁওতাবাজি সৃষ্টি করার জন্য গঠিত হয়নি। লড়াই করে অধিকার আদায়ের জন্যই এই সংগঠনের সৃষ্টি।

এই সংগঠন ঘোষনা করেছে, সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী বাতিলের দাবিতে বাংলাদেশের সংখ্যালঘু জনগণকে এক করে বিরাট আকারে সমাবেশ করার উদ্যোগ নেবে।আগামী ডিসেম্বরে ঢাকায় এই সমাবেশ অনুষ্ঠিত হবে।

বস্তুগতভাবে যখন আমরা এক হয়ে এই ধরণের কর্মসূচি সফল করতে পারবো তখন আমাদের মধ্যে যে চেতনা জেগে উঠবে তাইই আগামীতে বৃহত্তর এক ঐক্যের ভীত গঠন রচনা করবে। বাস্তব সমস্যাগুলোর বিরুদ্ধে বাস্তব লড়াইএ একে অপরে যদি পাশাপাশি থাকি তবেই ঐক্য সম্ভব। জাতিসত্তা মুক্তি সংগ্রাম পরিষদ নওগাঁয় সান্তাল জাতিসত্তার জনগণের পক্ষে দাড়িয়েছে। সেখানে প্রতিবাদ সমাবেশ করেছে। যখন কক্সবাজারের টেকনাফে কোনো জাতিসত্তার জনগনের উপর হামলা হয় তখনই জাতিসত্তা মুক্তি সংগ্রাম পরিষদ ছুটে যায়। রামু-উখিয়া-পটিয়ায় বৌদ্ধ মন্দিরে হামলা-ভাঙচূর লুটপাটের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ সংঘটন করে।এভাবেই ঐক্য হবে বাস্তবসংগ্রামে এক হয়ে লড়াই জারি রেখে।

Advertisement