এই পোস্টটি ৪০১ বার পড়া হয়েছে


পার্বত্য চট্টগ্রামে সাহিত্য চর্চা নিয়ে কিছু ভাবনা

পার্বত্য চট্টগ্রামের সাহিত্য  এবং সাহিত্য চর্চা শিরোনামে সিএইচটিবিডি ব্লগে অজল দেওয়ান যে লেখা লিখেছেন তা ফেসবুকে শেয়ার করার পরে আমি  এ বিষয়ে তিনটি মন্তব্য করি। সে মন্তব্যগুলো এখানে আমি হুবহু তুলে ধরছি।

(এক)

আসলে সাহিত্য চর্চা হচ্ছে জীবনেরই অঙ্গ! জীবনের উত্থান পতন ভাবাবেগ আবেগ উৎকন্ঠাকেই সাহিত্যে ধারণ করতে হয়। এই যে ধারণ করার কথা বললাম, তা বানানোর মতো জিনিস নয়, তা অন্তরের অন্তস্থ থেকে উঠে আসার বিষয়।

কিন্তু অনেকসময় আমাদের এই ‘সাহিত্য’কে যেন কিছু ফাই-ফরমাশ খাটতেই ব্যবহার করতে হয়! এই কথা বলতে বাধ্য হচ্ছি এই কারণে যে, যিনি সাহিত্য রচনা করেন বা যিনি সাহিত্য চর্চা করেন বা যিনি কবিতা-গল্প-নাটক-প্র্রবন্ধ-উপন্যাস রচনা করতে বসেন, তাকে যদি নিজের আবেগ-ভাবাবেগ-উৎকন্ঠা নিয়ে চিন্তা করতে করতে সেই আবেগ-ভাবাবেগ .. রূদ্ধ করে প্রকাশ করতে হয় কারো মনোরঞ্জনের বা মনোতোষনের জন্য ‘সাহিত্য’ মানে কবিতা-গল্প-নাটক প্রবন্ধ বা উপন্যাস! তবে তাকে আদতেই কি সাহিত্য পদবাচ্যের মধ্যে গন্য করা যাবে?!

কিন্তু আমরা পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষেত্রে তা-ই দেখছি! সাহিত্য বানানোর মতো নয়! সাহিত্য সৃষ্টির বিষয়। সৃষ্টিশীলতার বিষয় থাকে এতে। আমরা সাহিত্যকে এই বানানোর দশা থেকে মুক্তি দিতে সমর্থ হবো এই আশা রাখতে পারি!

 

(দুই)

এটা বলা বোধহয় অত্যুক্তি হবে না যে, চিন্তা বা চেতনার গভীরতাবোধ বা দার্শনিক গভীরতাসমৃদ্ধ মননই পাারে সৃজনশীল যুগান্তকরী সাহিত্য সৃষ্টি করতে। এবং এই ধরণের সাহিত্যই পারে সমাজকে পথ দেখাতে, সমাজে নতুন দিশা দিতে।

সমাজকে, সমাজের গতি বা অগতিকে গভীর দার্শনিক বোধ থেকে জেনে বুঝে আত্মস্থ করেই তবে সৃষ্টি হতে পারে মহান সাহিত্য! কোনো সমাজে যখন একদিকে মহান সাহিত্য গুণবাচ্য মাস্টারপিস সৃষ্টি হয় তখন কিন্তু সেখানে একই সাথে সৃষ্টি হয় নতুন ধারার এক লড়াইয়ের! চীনের ক্ষেত্রে ল্যু সুন এবং চীনা কম্যুনিস্ট পার্টির লড়াইয়ের অগ্রগতি যেন একই সাথে গাঁথা!

আর সোভিয়েত রাশিয়ায় লেনিনের লড়াইয়ের সাফল্যই যেন এনে দিয়েছে ম্যাক্সিম গোর্কি! রাশিয়ার যেদিন সমাজকে অণুবীক্ষণিক চোখে দেখে তাকে তুলে আনলেন মাস্টার পিস আকারে আনা কারেনিনা, বঞ্চিত লাঞ্ছিত ইত্যাদির লেখকগণ তখনই তো দেখা দিলো বিপ্লবেব পথরেখা দূর থেকে অতিদূর থেকে! ফ্রান্স দেশে গভীর দার্শনিক চোখ দিয়ে ভোলতেয়ার যখন লিখলেন তার রচনা তখন হয়তো একই সাথে এই গভীর অন্তদৃষ্টি ছড়িয়ে পড়েছিল জনতার কাতারে, জন নেতৃত্বের কাতারে! এ যেন বাণের জল! অঝোর বৃষ্টিধারা! অফুরন্ত তার শক্তি! অকূল তার কূল!

এবং আমাদের এই পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষেত্রেও এই গভীর অন্তদৃষ্টি দিয়ে গভীর চেতনাবোধ ও গভীরতরভাবে মাটিবিদ্ধ শিকড় নিয়ে, চিন্তা দিযে, চেতনা দিয়ে, ভাব দিয়ে, দার্শিনিক বোধ দিয়ে বা সংস্কৃতি-ইতিহাস চেতনাবোধ দিয়ে যদি কেউ না লেখে কবিতা, না লেখে গান, না লেখে গল্প, না লেখে প্রবন্ধ, নাটক বা উপন্যাস বা অন্য কোনো কিছু! এবং না জাগে যদি জনতারে মাঝে এই সৃষ্টির ঐকতান! তবে হাজার লাইনে কাগজ ভরালেও কিই বা আসে যায়! এই জনগণের জন্য!? আমরা কি প্রস্তুত সেই গভীর আন্তদৃষ্টি দিয়ে এই আমাদের জায়মান শংকাবহুল জীবনকে দেখতে? চিনুয়া আচেবের মতো আমাদের পূর্বপূরুষদের ইতিহাসকে ধারণ করতে?

 

(তিন)

জাতির বিকাশের সাথে সাহিত্যের বিকাশ ঘটে থাকে। কিন্তু তা কিভাবে? সংক্ষেপে বলছি। একটি জাতিসত্তা বা জনগোষ্ঠীর মাঝে যতক্ষন পর্যন্ত দৈনিন্দন ব্যবহারের ভাষা, তা মান্যভাষাও হতে পারে, দৈননন্দিনভাবে সে জাতিসত্তা বা সে জনগোষ্ঠীর জনগণ ব্যবহার না করছে ততক্ষণ পর্যন্ত কিন্তু সে জাতির ভাষার বিকাশ হতে পারে না। বাংলা ভাষার ক্ষেত্রেও তা সত্য ছিলো।

যেদিন থেকে বাংলা ভাষা দৈনন্দিন সংবাদ প্রচারের মাধ্যমে পরিণত হয়েছে সেদিন থেকেই সমৃদ্ধ হয়েছে তার কবিতা, কেউ লিখেছে গল্প বা কেউ উপন্যাস, প্রবন্ধ। সুতরাং চাকমা ভাষা ও সাহিত্য বা অন্য জাতির ভাষা ও সাহিত্যের বিকাশ যদি সত্যিই ঘটাতে হয় তবে সাহসী হয়ে আমাদেরও সেই পথেই নামতে হবে!

 

নতুবা আমরা আরেক কাজ করতে পারি! তা হচ্ছে, চিনুয়া আচেবে তার জাতির কষ্টের কথা নিজের ভাষায় রচনা করেননি। করেছিলেন অন্য একটি আন্তর্জাতিক ভাষায়। কিন্তু এতে তার লেখার মধ্যে যে গভীরত্ব রয়েছে, যে ভাব ফুটে উঠেছে তার কিন্তু কমতি ঘটেনি। নিজের সমাজের ইতিহাসের অনেক কিছু জানার পরই তিনি তার লেখা লিখেছিলেন।

আমাদের দুটোই পথ সামনে-

১. সাহসী উদ্যমী হয়ে নিজের ভাষার পত্রিকা প্রকাশ করে ভাষাকে বিকশিত করতে হবে। (মাঝে মাঝে একটি দুইটি প্রকাশনা প্রকাশ করে এই ভাষার বিকাশ করা সম্ভব নয়। )

২. নতুবা, নিজের ভাষার সাধারণ চর্চার সাথে সাথে জাতি বা সমাজ বা ব্যক্তির ভাব-কষ্ট-বেদনা-আর্তনাদকে রূপান্তরণ করতে হবে অন্য বহুল প্রচলিত ভাষার মাধ্যমে। এ দুটো পথের প্রথমটিকে আমরা ভালোবেসে গ্রহণ করতে চেষ্টা করলেও আদতেই বাস্তব জীবনে আমরা দ্বিতীয় পন্থারই চর্চা করে যাই নিত্যনিয়ত!

Advertisement