এই পোস্টটি ১,০২৭ বার পড়া হয়েছে


দুই পার্বত্য জেলা থেকে বান্দরবান একটু অন্যরকম- Jidit Chakma

লেখার বিষয়বস্তু গুরুত্বপূর্ণ বিবেচিত হওয়ায় Jidit Chakma-র ফেসবুক স্ট্যাটাস থেকে নিচের লেখাটি নেয়া হলো-

আপনার কখনো বান্দরবান যাওয়া হয়েছে কিনা জানি না, কিংবা যাওয়া হলেও লক্ষ্য করেছেন কিনা তাও জানি না, অন্য দুই পার্বত্য জেলা থেকে বান্দরবান একটু অন্যরকম। পাহাড়-নদী-ঝর্ণা আর সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যতা এখানকার প্রধান বৈশিষ্ট্য কিংবা সামরিক পর্যটনের ভাষায় বললে বলা যায় “প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আর সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক অপূর্ব লীলাভূমি”। হ্যাঁ! যে কেউ এক দেখায় একমত পোষণ করবেন, বান্দরবান সুন্দর! আর সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি! বান্দরবানের পথে পথে সাইনবোর্ড দিয়ে টাঙানো রয়েছে সেই সম্প্রীতির বার্তা!

সম্প্রীতির কয়েকটা ঘটনা বলি, তার আগে বলে নিই, বান্দরবানে কখনো সাম্প্রদায়িক হামলা কিংবা গণহত্যা সংঘটিত হয়নি। পাহাড়ের অন্যান্য অঞ্চলে প্রায়ই শোনা যায় পাহাড়ি-বাঙালী সংঘর্ষের কথা, কিন্তু সৃষ্টিকর্তার অপার মহিমায় বান্দরবানে এমন কোন ঘটনার কথা কখনোই শোনা যায়নি! tongue emoticon হ্যাঁ, মূল কথায় ফিরে আসি, সম্প্রীতির কয়েকটি উদাহরণ-
একটি তঞ্চংগ্যা গ্রাম, বান্দরবান মূল শহরের কাছেই। গ্রামটির সব জনগোষ্ঠী তঞ্চংগ্যা, কিন্ত জায়গাগুলোর মালিক হচ্ছেন নোয়াখালী-চাঁদপুর থেকে আগত কয়েকজন বাঙালি ভদ্রলোক। চমৎকার সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি!!! নিজের জায়গায় ভদ্রলোকেরা পাহাড়িদের বসবাস করতে দিয়ে কি উদার মানসিকতা আর সম্প্রীতির বার্তা ছড়িয়ে দিচ্ছেন।

এক বন্ধুর সাথে গল্প হচ্ছিল, বন্ধুটি কয়েকদিন আগে কয়েকজন ছোটভাইকে নিয়ে আলিখ্যাডং(আলিকদম)এর ভিতরে তাদের ম্রো আত্মীয়দের পাড়ায় বেড়াতে যাচ্ছে। পথে দেখা হল এক সেনা চেকপোষ্টের সাথে =D। চেকপোষ্টের সেনারা আমার বন্ধুদেরকে অভ্যর্থনা জানাল আর তাদের নিরাপত্তা grin emoticon নিয়ে উদ্বিগ্নতা tongue emoticon প্রকাশ করল!! এবং অনুরোধ জানাল আর ভিতরে না গিয়ে ফিরে যেতে, কারণ বার্মার বিদ্রোহীরা সেখানে ওত পেতে রয়েছে! যাই হোক, শেষপর্যন্ত বন্ধুরা নিজেদের জীবনের দায় নিজের হাতে নেওয়ার পর আত্মীয়ের বাড়িতে যাওয়ার জন্য সেনাদের সম্প্রীতির বেড়া ডিঙাতে পারল। পাড়ায় গিয়ে আবার আরেক সম্প্রীতির খোঁজ মিলল, এখানকার অধিকাংশ ম্রো পরিবার চলে যাচ্ছে বার্মা কিংবা বর্ডারের কাছাকাছি পাহাড়গুলোতে। কারণ এখানকার জায়গাগুলো খারাপ, এই খারাপ জায়গায় ম্রোদের বসবাস করা শোভা পায় না, তাই সাতক্ষীরা কিংবা বরিশাল থেকে আগত উদার বাঙালি ভদ্রলোকেরা সেই খারাপ জায়গাগুলো নিয়ে নিচ্ছে আর বিনিময়ে দিচ্ছে নগদ পাঁচ-ছয় হাজার টাকা। যারা নিজেদের ভাল না বুঝে এই খারাপ জায়গায় থাকতে চাচ্ছে তাদেরকে বার্মা কিংবা জীবন নদীর ওপারে বিনামূল্যে পৌঁছে দেয়ার ব্যবস্থা নিচ্ছেন সেই ভদ্রলোকেরা আর সেনা সদস্যরা তাদের সহযোগিতা করে সম্প্রীতির মাত্রা বাড়িয়ে দিচ্ছেন।

মাস কয়েক আগে এক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকের সাথে এক জরিপ কাজে অংশগ্রহণের সুযোগ ঘটে। স্যার আমাকে জানালেন আরেক বিচিত্র ধরণের সম্প্রীতির কথা। এক সম্মানিত ডাকাত(বর্তমানে ব্যবসায়ী) আবাস গড়েছেন বান্দরবানের এক এলাকায়। তিনি সম্প্রীতির উদ্দেশ্যে সেই এলাকায় একটি বাজার পর্যন্ত বানিয়ে দিয়েছেন। হাটবারে সেখানে আনাগোনা ঘটে মানুষজনের, আশেপাশের এমনকি দূর পাহাড়ের জংলীরাও সেখানে চলে আসে মালামাল বিক্রির জন্য। বিক্রিবাত্তা শেষে সবাই সম্মানিত ব্যবসায়ী মহোদয়ের বানানো দোকানঘরে বসে আড্ডা দেয়, গল্প করে। তারা গল্প করে কোন পাহাড়টা সুন্দর, কোন ঝর্ণাটার প্রবাহ যুবতীর উচ্ছ্বাসিত হাসির মতন কিংবা কোন পাহাড়ে কত দামী গাছ পাওয়া যায়। এরপর সেই জমিটা, সেই পাহাড়টা, সেই ঝর্ণাটা সম্মানিত ব্যবসায়ী মহোদয়ের নিজের করে নেয়াটা সময়ের অপেক্ষা মাত্র। (ডাকাতি অভিজ্ঞতার কারণে জানেন কিভাবে নিজের করে নিতে হয়)

সেদিন কিনিথেউতে গিয়ে চমকে উঠলাম! জানতাম এখানকার পাহাড়ের গাছগুলো বিক্রি হয়ে গেছে, এখন আশেপাশে বড় কোন গাছের দেখা পাওয়া বিরল ঘটনা। কিন্তু সেদিন দেখলাম কিনিথেউর বুক চিরে ট্রাক্টর-র এর গভীর দাগ আর সেই দাগ নেমে গেছে নিচের ঝিড়ি পর্যন্ত। ব্যাপারটা জিজ্ঞেস করে জানলাম কুমিল্লা-ফেনী থেকে আগত উদার ব্যক্তিবর্গ সহ্য করতে পারছিলেন না ঝিড়ির বুকে পাথরের সমাবেশকে, তাই তারা হেডম্যানকে কিছু টাকা দিয়ে পাষাণসমূহ ছড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে। ফলাফল- সামনের বছর খরাটা দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হবে। খোঁজ নিয়ে জানলাম এই পাষাণগুলো বান্দরবান-রুমা সড়কের উন্নয়নে ব্যায় করা হচ্ছে। চোখে পড়ল রাস্তার পাশে উচ্চতর বট-নাম না জানা বৃক্ষগুলো কর্তন করা হচ্ছে রাস্তার উন্নয়নের জন্য। এবং সম্প্রীতিকে নিয়ে যাওয়া হবে বগালেক পেড়িয়ে বার্মার সীমান্ত পর্যন্ত।

বান্দরবানে যে কেউ-ই জমি কিনতে পারে। সেখানে রাস্তার পাশে, পথের ধারে “এই জমির মালিক জমিরউদ্দিন/রহিমউদ্দিন/ করিমউদ্দিন/ব্লা ব্লা……” ধরণের সাইনবোর্ড প্রায়ই চোখে পরে। এই হচ্ছে সম্প্রীতির রূপ। সম্প্রীতির ঠেলায় ম্রো, খুমী আর অন্যান্যরা চলে যাবে ওপারে(দেশ কিংবা জীবন)।

মাঝে মাঝে আমাদের পেজগুলোতে চিঠি আসে। লেখা থাকে “আমার পাহাড় আর পাহাড়ের মানুষদের খুব ভাল লাগে। আমার ইচ্ছে করে পাহাড়ে একটা জায়গা কিনে সেখানেই জীবনটা কাটিয়ে দিই” । এই চিঠিগুলো পেলে কেন জানি এক পাহাড়প্রেমী ছাগু’র কথাগুলো মনে পড়ে। ছাগুটা বলেছিল, “আমার পাহাড় খুব ভাল লাগে, পাহাড়ের মানুষদের আমার খুব আপন মনে হয়, তবে সবচাইতে বেশি ভাল লাগে পাহাড়ি মেয়েদের :P”

(চলবে…………)

Advertisement