এই পোস্টটি ১,১৬৭ বার পড়া হয়েছে


কিভাবে ভালো একজন নেতা হওয়া যায় বা How to be a Good Leader: চৌ এন লাই

প্রারম্ভিকা:

চৌ এন লাইএর এই লেখাটির মূল শিরোনামটি ছিলো – Outline of a Talk on Leadership and Review of Work। অর্থাৎ, নেতৃত্ব বিষয়ে আলোচনার সংক্ষিপ্তসার এবং কাজের পর্যালোচনা। তিনি চীনের কমিউনিস্ট পার্টির সেন্ট্রাল কমিটির দক্ষিণাঞ্চল ব্যুরো-এর কর্মীদের সাথে এক আলোচনায় এই কথাগুলো বলেন। লেখার তারিখ ১৯৪৩ সালের ২২ এপ্রিল। মার্ক্সিস্টস.অর্গ ওয়েবসাইটে প্রকাশিত ইংরেজী সংস্করণ থেকে আমি তা বাংলায় অনুবাদ করার চেষ্টা করেছি।

নেতৃত্ব নিয়ে এই লেখাটিকে আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে। তাই আমি তার অনুবাদ করার চেষ্টা করেছি।

আজকাল সাম্রাজ্যবাদের ক্ষয়কালীন পুঁজিবাদী এই যুগে নেতৃত্ব বা নেতা বলতে যে কী বোঝায় তা্ -ই যেন নৈরাজ্যিক হয়ে উঠেছে! নেতা মানে অনেকের কাছে বোঝায় বাহাদুরী দেখানো-ই , কারো কাছে জনতার দিকে ছরি ঘোরানোই যেন নেতা বনে যাওয়া! কারো চোখে নেতা মানে তার অগাধ অর্থসম্পদ! তার অগাধ ক্ষমতা! তার কথায় সবাই উঠবে আর বসবে! কেউ নিজেকে নেতাই মনে করে! কেউ নেতাগিরি করে!

কারো কাছে নেতা মানে তার কয়েকজন সাগরেদ থাকবে, যারা তাই ফাই ফরমাশ খাটবে! কেউ নেতা মানে বোঝে শুধু নির্দেশ দাও, নির্দেশ দিতে জানলেই যে নেতা!

এই সব বৈশিষ্ট্যই যেন অনেকের কাছে নেতা বনে যাওয়া!

কিন্তু যারা সমাজের সত্যিকার কিছু চান, যারা সমাজকে এগিয়ে নিতে চান, সমাজে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন চান, তাদের কাছে নেতা মানে কী বোঝায় বা কী বোঝাতে পারে এ নিয়েই চৌ এন লাইয়ের লেখায় আলোচনা করা হয়েছে।

অনুবাদে নানা দুর্বলতা থাকাটাই স্বাভাবিক। আমাকে বলতে হচ্ছে, ওয়ার্ড টু ওয়ার্ড অনুবাদ করার চেষ্টা না করে অন্তর্বস্তু ঠিক রেখে লেখাটির অনুবাদ করার চেষ্টা আমি করেছি। আমার কাছে মনে হয়েছে ভাবটি ফুটিয়ে না তুলতে পারলে শুধু অনুবাদ করে এই লেখার বিষয়বস্তু তেমন পাঠযোগ্য নাও হতে পারে।

সবাই আন্তরিকতার সাথে লেখাটি পড়বেন এই আশা করছি।

এটি পড়ে নেতৃত্ব বিষয়ে যদি কেউ সচেতন হয়ে ওঠে তাতেই অনুবাদকের সার্থকতা!

অনুবাদ করতে রীনা দেওয়ান বরাবরের মতো সহায়তা করে গেছেন।]

নেতা হিসেবে কে গণ্য হবেন

যেকোনো কর্মী বা ক্যাডারকে সময়ে সময়ে বা কোনো কোনো সময় নেতৃত্বের কাজ করতে হয়। এবং হতে পারে তিনি তা করেই যাচ্ছেন। যাহোক, নেতৃত্বের কাজটি একেবারে নিচ থেকে মধ্য ও উপরের সকল স্তরেই থেকে থাকে।

যারা হোঙেন ও ঝেঙঝিয়ানে স্টাফ হিসেবে কাজ করছেন তাদের মধ্যে কাজের ধরণের মধ্যেই শুধু পার্থক্য রয়েছে। এতে নেতৃত্বদানকারী এবং নেতৃত্বমান্যকারীর মধ্যে তেমন বিশেষ পার্থক্য নেই, এমনকি কর্মী এবং  যারা কর্মী নন তাদের মধ্যে তেমন পার্থক্য নেই। যদিও হোঙেন এবং ঝেঙঝিয়ান এলাকার কর্মীরা এবং যারা নিউ চাঙনা ডেইলীতে কাজ করছেন তারা নেতৃত্বের দায়িত্ব কাঁধে নেননি , তারপরেও বস্তুত বলতে গেলে তারাই নেতা।

একজন নেতার যে ভূমিকা গ্রহণ করতে হবে

একজন নেতা যে কোনো কাজ করার সময় অবশ্যই পার্টির যে অবস্থান সে দিকে খেয়াল করে অগ্রসর হবেন। তবে এটি একটি গতানুগতিক বক্তব্যমাত্র। সুনির্দিষ্টভাবে বলতে গেলে, একজন নেতৃত্বস্থানীয় কর্মীর নিচের গুণগুলো থাকা দরকার-

১. তাকে মার্ক্সবাদী-লেনিনবাদী বিশ্বদৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করতে হবে। এবং বিপ্লবী জীবনবোধ গড়ে তুলতে হবে।

২. নীতির প্রশ্নে তিনি হবেন আপোষহীন।

৩. জনগণের সংগ্রামের  প্রতি অবিচল অনুগামী হবেন।

৪.  তিনি পড়াশুনা বা শিক্ষাগ্রহণ করতে আন্তরিক হবেন।

৫. তিনি  ধৈর্যশক্তিসম্পন্ন একজন সংগ্রামী হবেন।

 

নেতা এবং নেতৃত্বদানকারী সংগঠনসমূহ

১. যৌথ নেতৃত্ব এবং  পরবর্তী উচ্চস্তরের নেতৃ্ত্বে তার নিচের স্তরের নেতৃত্ব পরিচালিত-

আলোচনা/পর্যালোচনা ও শ্রমবিভাজনের ক্ষেত্রে নেতৃত্ব হবে ঐক্যবদ্ধ/সুসংবদ্ধ, এককেন্দ্রীক ও গণতান্ত্রিক।

২. ব্যক্তিকেন্দ্রীক দায়িত্ববোধ ও নেতৃত্ব-

বিশেষভাবে পশ্চাদ্ভাগের এলাকার ক্ষেত্রে এই ব্যক্তিকেন্দ্রীক নেতৃত্বের প্রয়োজন পড়ে। তবে তার মাধ্যমে এটা বোঝায় না যে, সামষ্টিক নেতৃত্বকে জলাঞ্জলি দেয়া যাবে।

৩. সরাসরি ব্যক্তিগত হস্তক্ষেপ এবং উপর থেকে সিদ্ধান্ত প্রদান বিষয়ে-

এটা সাধারণত স্বাভাবিক কর্মপদ্ধতির পর্যায়ভুক্ত নয়, তবে বিশেষ প্রেক্ষিতে তা করা যায় বা কোনো উদাহরণ সৃষ্টির জন্য তার ব্যবহার করা যেতে পারে।

 

সঠিক নেতৃত্বের মানে কী?

স্তালিন যা বলেছেন তার ব্যাখ্যা আমি করতে চাই:

১. প্রথমেই বলা প্রয়োজন যে, অবশ্যই যথাযথ বা সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

প্রথমত, নেতৃ্ত্বকে পরিস্থিতি প্রেক্ষাপটের মূল্যায়ন করতে হবে এবং সম্ভাব্য পরিবর্তন সম্পর্কে তার ধারণা থাকতে হবে। একটি নির্দিষ্ট স্থানে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য বিশেষ পরিস্থিতি বিষয়ে তিনি জানার চেষ্টা করবেন।

দ্বিতীয়, তাদের কাজকে পার্টির সাধারণ কাজের সাথে সম্পর্কিত করে তুলতে হবে। এবং একটি নির্দিষ্ট সময় বিবেচনা করে কাজ ও নীতিকে একসাথে এগিয়ে নিতে হবে।

তৃতীয়, এবং এই নীতি অনুসারেই তাকে/তাদের/নেতৃত্বকে সমসাময়িক প্রেক্ষাপট/পরিস্থিতি বিবেচনা সাপেক্ষে যুগোপযোগী শ্লোগান ও ট্যাকটিক্স বা পন্থা নির্বাচন করতে হবে।

চতুর্থত, এরপর তাদের বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা ও নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ করতে হবে।

এ সবকিছুই তাদেরকে সুগভীর অনুসন্ধান, বাস্তব অবস্থা বা পরিস্থিতি সম্পর্কে জ্ঞান সংগ্রহ এবং পার্টির নীতি আদর্শকে ঠিক রেখেই লক্ষ্য উদ্দেশ্যকে সম্পৃক্ত করতে হবে।

 

২. সঠিক সিদ্ধান্ত অবশ্যই কার্যকর করতে হবে।

প্রথমে, পরিকল্পনা কার্যকর করার জন্য পথ বা পদ্ধতি ঠিক করতে নেতৃত্বকে অবশ্যই আলোচনা সভা ডাকতে হবে।

দ্বিতীয়ত, নেতৃত্বকে অবশ্যই যোগ্য ব্যক্তি নির্বাচন করতে এবং তাদের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য ক্ষমতা বা দায়িত্ব প্রদান করতে হবে।

তৃতীয়ত, দায়িত্বপ্রাপ্তদের কাছে/সবার কাছে পার্টি পরিকল্পনা বোধগম্য করতে নেতৃত্বকে প্রচেষ্টা চালাতে হবে।

চতর্থত, উদাহরণ সৃষ্টির জন্য নেতৃত্বকে সরাসরি পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য ব্যক্তিগতভাবে অংশ নিতে হবে। এভাবে নিজে বাস্তবে অংশ নিয়ে নেতৃত্ব আবিষ্কার করবে আদতেই পার্টি  লাইন ও কৌশল ঠিক রয়েছে কিনা বা তার কোনো পরিবর্তন সাধন করতে হবে কিনা।

৩. সিদ্ধান্ত যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হয়েছে কিনা অবশ্যই তার পর্যালোচনা করতে হবে। এই ধরণের পর্যালোচনা করার পদ্ধতি হচ্ছে-

ক) ফাঁকা বুলিতে কান না দিয়ে আদতেই কী কাজ হয়েছে তার আলোচনা করতে হবে বা তার দিকেই দৃষ্টি দিতে হবে।

খ) কাগজে কলমে কী পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে আমরা শুধুমাত্র সেদিকে নজর দেবো না। বরং, কাজটি হেলাফেলা করে বা গতানুগতিকভাবে সম্পন্ন করা হয়েছে নাকি উদ্যম-উদ্যোগ নিয়ে সম্পন্ন করা হয়েছে সেদিকে আমাদের নজর দিতে হবে।

গ) আমাদের আধেয়-র দিকে দৃষ্টি দিতে হবে, আধারের দিকে নয়। অর্থাৎ, কাজ কী হয়েছে সেদিকে দৃষ্টি দিতে হবে। কথা কী হয়েছে সেদিকে নয়।এবং তারপর দেখতে হবে সিদ্ধান্ত সত্য সত্যই সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা হয়েছে কিনা অথবা কোথাও তার বিকৃত উপস্থাপন করা হচ্ছে কিনা।

ঘ) এই পর্যালোচনা শুধু যে উপর থেকে নিচে করা হবে তা নয় বরং, নিচ থেকে উপরেও তার পর্যালোচনা করতে হবে।

ঙ) পর্যালোচনা করার সময় নেতৃত্বকে ব্যক্তিগতভাবে উপস্থিত থাকতে হবে।

 

স্তালিন যেমন বলেছিলেন, নেতৃত্বকে অবশ্যই জনগণের সাথে গভীর সম্পর্ক রাখতে হবে। এবং নেতৃত্ব এবং জনগণ যে অভিজ্ঞতা লাভ করেছেন তার মধ্যে সংশ্লেষ ঘটাতে হবে। শুধুমাত্র এভাবেই সঠিক নেতৃত্ব সৃষ্টি হতে পারে।

 

নেতৃত্বের করণীয় কর্তব্য

কমরেড মাও সেতুঙ বলেছেন, নেতৃত্বের করণীয় কর্তব্যের মধ্যে রয়েছে কর্মী বা ক্যাডারদের উপযুক্তভাবে কাজে লাগানো এবং নীতিকৌশল বাস্তবায়ন করা। এটাই সত্য। ভেঙে বলতে গেলে, আমার মতে, সেগুলো হবে-

১. নেতৃত্বস্থানীয় কর্মীদের আদর্শিক ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রতি নজর দিতে হবে। এটার মাধ্যমে এটা বোঝায় যে, তারা বা নেতৃত্ব প্রতিনিয়ত তাদের আদর্শিক মান উন্নত করবে এবং তাদের নিজস্ব রাজনৈতিক প্রশিক্ষণ দৃঢ়বদ্ধ করবে।  আমরা আমাদের কমরেডদের নিচের বিষয়ে মনোযোগ দিতে বলবো:

ক)  গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে মনোযোগ নিবদ্ধ করা।

খ) রাজনৈতিক নজরদারী সুসংহত করা।

গ) তাত্ত্বিক মান বাড়িয়ে তোলা।

ঘ) পার্টির অভ্যন্তরে এবং বাইরে আদর্শিক সংগ্রাম তীব্রতর করে তোলা এবং

ঙ) পার্টির নীতিকৌশল ও সফলতা বিষয়ে সক্রিয়ভাবে প্রচারণা চালানো।

 

২. নেতৃত্বদানকারী কর্মীদের অবশ্যই সাংগঠনিক নেতৃত্ব প্রদান বিষয়ে সুচিন্তিত মত দিতে হবে। যখন রাজনৈতিক লাইন ঠিক হয়ে যায়, তখন রাজনৈতিক কাজই সবকিছুর নির্ধারক হবে। নিচের কয়েকটি পয়েন্টের উপর আমরা কমরেডদের নজর দিতে বলবো:

ক) সাংগঠনিক নেতৃত্বকে রাজনৈতিক নেতৃত্বের কাতারে আনতে হবে। অন্যভাবে বলতে গেলে সকল কাজকেই নীতিকৌশলের ভিত্তিতে ঠিক করতে হবে এবং  রাজনৈতিক কাজের সাথে সংযুক্ত হতে হবে।

খ)  নিত্যদিনের সকল কাজ সহ সাংগঠনিক কাজসমূহকে নিশ্চিতভাবেই পার্টির রাজনৈতিক উদ্দেশ্য সফলভাবে বাস্তবায়নের জন্যই করতে হবে  এবং তা করতে হবে পার্টির কর্মপরিকল্পনার সাথে সংগতি রেখে।

গ)  পার্টিকে দৈনন্দিন নেতৃত্ব পরিচলনার দিকে গুরুত্ব দিতে হবে। এতে পার্টি সংগঠনসমূহ  তৃণমূলের সাথে সম্পৃক্ত থাকবে এবং তাদের কাজ অনেক অনেক বেশি মূর্ত নির্দিষ্ট হবে।

ঘ) সকল সমস্যা থেকে উত্তরণের জন্য পার্টি সংগঠন ও জনগণকে গতিশীল করতে হবে।

ঙ) আমাদের অবশ্যই সকল ধরণের সুবিধাবাদীতার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করতে হবে। অর্থাৎ, কর্তব্যে অবহেলা বা ফাঁকি দেয়া, ফাঁকা বুলি আওড়ানো , ক্রোধ, আমলাতান্ত্রিকতা, আনুষ্ঠানিকতাবাদ(ফরমালিজম) লাল-ফিতার গতবাঁধা কাজ বা গতানুগতিকতা ইত্যাদি নানাধরণের সুবিধাবাদিতা, দুর্নীতি, অধঃপতন ইত্যাদি আমাদের পরিহার করতে হবে।

৩. কর্মী নির্বাচনের সময় এবং তাদের কাজে লাগানোর সময় দূরদর্শি বা বিচক্ষণ হবে। এটাও সাংগঠনিক কাজের অংশ। তবে তাকে পৃথকভাবেও আমলে আনা যায়। কর্মী নির্বাচনের সময়  প্রথমে রাজনৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতার দিকে খেয়াল করতে হবে। এরপর কর্মী নির্বাচনের ক্ষেত্রে দক্ষতা এবং গুণাবলী এ দুটো যৌথভাবে হবে অপরিহার্য মানদন্ড। রাজনৈতিক নীতিবোধের ভিত্তিতে কর্মী নির্বাচন না করার কারণে পার্টির যে ক্ষতি হয়েছে সে বিষয়ে স্তালিন একবার আলোচনা করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, এমন ধরণের ব্যক্তি যেখানেই যান সেখানেই  সাথে একগাদা সফরসঙ্গি থাকে এবং তারা শুধুমাত্র তাদেরই নিয়োগ করেন যাদেরকে তারা তাদের ‘নিজস্ব লোক’ বিবেচনা করেন।

সংশোধনবাদী আন্দোলনের উপর মাও সেতুঙ যে রিপোর্ট প্রদান করেন সেখানে তিনি এ ধরণের ব্যক্তিকে “সততাহীন” ব্যক্তি হিসেবে মন্তব্য করেছিলেন। এটা  তাদেরই ব্যর্থতা যারা হলেন ” খাস প্রতিনিধি যাদের বিচরণ সকলক্ষেত্রে” । তবে একজন কর্মীর রাজনৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতা বিষয়ে বলতে গেলে তাকে স্থান-পরিস্থিতি ও সময় বিবেচনায় সঠিকভাবে কাজে লাগানোটাই কিন্তু মুখ্য।

 

৪. অবশ্যই কাজের পর্যালোচনা করতে হবে। ব্যক্তিগতভাবে একজন কর্মীর কাজের মূল্যায়ন এবং কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন বিষয়ে অবশ্যই পর্যালোচনা করতে হবে। স্তালিন বলেছিলেন, পর্যালোচনার উদ্দেশ্য হচ্ছে:

প্রথমত, কর্মীর গুণাবলী সম্পর্কে জানা বা বোঝা।

দ্বিতীয়ত, কার্যনির্বাহী কাঠামো বা বডির দক্ষতা এবং ভুলভ্রান্তি চিহ্নিত করা।

তৃতীয়ত, যে কার্যাবলী/করণীয় বা নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছিলো তার গুণ/কার্যকারিতা বা ভুলভ্রান্তি  যাচাই করা।

অনেক নেতাই মনে করে এ ধরণের পর্যালোচনায় তাদের দুর্বলতা প্রকাশ পাবে,তাদের মান মর্যাদা চলে যা বা প্রেস্টিজ পাংচার হবে অথাব এতে তাদের নিজের ওপর আস্থায় ভাটা পড়বে। এটা ঠিক নয়, নেতা ভুল শুধরে তাদের মান বাড়ান, তা লুকিয়ে রেখে নয়। নেতাকে কঠোর পরিশ্রম করেই নিজের মান মর্যাদা অর্জন করতে হয়, বড়াই করে বা নিজেকে ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে উপস্থাপন করে নয়। ভুল শুধরাতে পারলে আস্থা বাড়বে, কমবে না। যারা সফল নয় এবং যারা শুধুমাত্র মুখ দেখানোতেই সজাগ থাকে তারাই ভুল বা দোষত্রুটি প্রকাশ করতে ভয় পায়।

৫. জনগণের সাথে থাকো। নেতা শুধু জনগণকেই শিক্ষা দেন না, বরং তাদের কাছ থেকেও তারা শিক্ষা নেন। এর কারণ হচ্ছে, নেতার নিজের জ্ঞান সীমিত এবং অভিজ্ঞতাও অপর্যাপ্ত। নেতা হলেই তার নিজের মধ্যে জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা গজাবে না, তাই জনগণের কাছে গিয়ে অভিজ্ঞতা অর্জন করা অপরিহার্য।

আমরা ঐ কমরেডকে বলবো-

ক) জনগণের কাছে যান, তাদের সাথে সম্পর্ক রক্ষা করুন এবং পারতপক্ষে কেনো সময় তাদেরই একজন হোন।

খ) জনগণের কথা শুনুন।

গ) তাদের কাছ থেকে শিখুন।

ঘ) তাদের লেজ না ধরে বা তাদের পিছনে পড়ে থাকা নয় বরং তাদের শিক্ষা প্রদানের উদ্যোগ নিন।

 

জনগণকে নেতৃত্ব দেয়া এবং তাদের বন্ধু হওয়া

১. জনগণকে পার্টি সদস্যদের মতো নেতৃত্ব দেয়া যায় না।জনগণকে  নেতৃত্ব দেয়ার সময় বা তাদের সাথে আচরণের সময় তারা এমন যেন না ভাবেন যে, আমরা তাদের উপর নেতৃত্ব ফলাচ্ছি/চাপিয়ে দিচ্ছি।

২. জনগণকে নেতৃত্ব দেয়ার মৌলিক পদ্ধতি হচ্ছে, তাদের উজ্জীবিত করা, তাদের উপর কমান্ডারী করা নয় বা তাদের আদেশ-নির্দেশ দেয়া নয়। শুধুমাত্র এমন এক পরিস্থিতিতে যখন প্রয়োজন উপস্থিত হয় এবং যখন গরিষ্ঠ অংশ মেনে নেয়, গুটিকয়েকমাত্র তখনো মেনে নেয় না তখনই আমরা বাধ্য হতে পারি সংখ্যাগরিষ্ঠের সিদ্ধান্তকে চাপিয়ে দিতে।

৩. জনগণকে নেতৃত্ব দেয়া ও তাদেরকে মিত্র বানানোর ক্ষেত্রে নেতাকে অনুসরণযোগ্য ভূমিকা নিতে হবে

৪. কোনো কোনো সময় নেতাকে অপমানজনক পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হলেও তা এড়িয়ে যেতে হবে।

৫. নেতাকে অবশ্যই ধৈর্য রেখে ও সজাগ থেকে কাজ করতে হবে। তার নিজের ভূমিকা সম্পর্কে এবং তিনি যে প্রভাবান্বিত করতে পারেন এ বিষয়ে তার নিজেকে আন্ডারএস্টিমেট করা উচিত হবে না।

নেতৃত্বের শৈলী

লেনিন এবং স্তালিন বর্ণিত নেতৃত্বের আর্ট হচ্ছে, নেতাকে আন্দোলন থেকে অতিদূরে যাওয়া যেমন উচিত নয়, তেমনি অধিক পেছনেও থাকার উচিত নয়। তাদের করণীয় ঠিক করে আন্দোলনকে এগিয়ে নিতে হবে।

মাও সেতুঙের মতে নেতৃত্বের আর্ট হচ্ছে, তাদের সামগ্রিকভাবে সমগ্র পরিস্থিতিকে বিবেচনায় আনতে হবে। সংখ্যাগরিষ্ঠের মতানুযায়ী চিন্তাভাবনা করবেন এবং মিত্রশক্তির সাথে একত্রে কাজ করবেন।

 

কাজের পদ্ধতি

১. আন্দোলন সংগ্রামে জড়িত থেকেই তাত্ত্বিক বিশ্বাস বা নীতিকৌশলের পরীক্ষা করা।

২. যে কোনা নির্দিষ্ট কাজের ক্ষেত্রে সংকল্পবদ্ধ হওয়া এবং নীতিপদ্ধতি পর্যালোচনা করা।

৩. বিপ্লবী আদর্শকে উচ্চে তুলে ধরে কাজের মানের উন্নতি করা।

৪. সমালোচনা-আত্মসমালোচনাকে উৎসাহিত করা এবং গণতন্ত্র চর্চাকে অগ্রাধিকার দেয়া।

৫. প্রশাসনিক হুকুমদারী নয়, উজ্জীবিত করতে চেষ্টা কর। শুধুমাত্র জরুরী পরিস্থিতিতে মাত্র আদেশ নির্দেশ প্রদান কর।

কাজের ধরণ/রীতি

কাজের ধরণের মধ্যে থাকবে-

১. লেনিনের কাজ করার ধরণের মধ্যে রয়েছে- রাশিয়ার বিপ্লবী দৃপ্তভঙ্গি এবং আমেরিকার করিৎকর্মা বৈশিষ্ট্য।

২. কমরেড মাও সেতৃঙের কাজের ধরণে রয়েছে- চীনের জনগণের নম্রতা এবং বাস্তববাদিতা; চীনের কৃষক সমাজের সরলতা এবং কঠোর পরিশ্রমী মানসিকতা; ধীমানগণের মত অধ্যয়নের প্রতি ভালবাসা এবং চিন্তার গভীরতা; বিপ্লবীদের মত নমনীয়তা এবং ঠান্ডামেজাজ; বলশেভিকদের মত ধৈর্য ও একাগ্রতা।

 

৩. দৈনন্দিন কাজে ঢিলেমি(সুবিধাবাদিতা) পরিহারের জন্য সংগ্রাম করতে হবে। বর্তমানে আামাদেরকে  মনসংযোগবিহিীন নিয়মবদ্ধ বা যান্ত্রিক কাজের ধারা; বাক-বাগীশতা; ঔদ্ধত্য, আনুষ্ঠানিকতা, রুটিনবাদিতাসহ সকল ধরণের কাজের ধারা যা পার্টি এবং মিলিটারির চমৎকার ঐতিহ্যকে ধ্বংশ করে এ বিষয়ে সংগ্রাম করবে হবে।

অনুবাদ সূত্র: মার্ক্সিস্টস.অর্গ

শেষ

Advertisement