এই পোস্টটি ৮৫৬ বার পড়া হয়েছে


চাকমা কবিতা নিয়ে আলোচনা প্রসঙ্গে: বিপ্লব এবং কবিতার বিকাশ আমার কাছে সমার্থক

ফেসবুক গ্রুপে চাঙমা কবিতা নিয়ে আলোচনা চলছে। আলোচনা করা হচ্ছে বাংলা ভাষায়। আলোচনায় যারা অংশ নিয়েছেন তাদের অনেকের মতামত বা মন্তব্য আমার চোখে পড়েনি, অর্থাৎ আমি সব মন্তব্য পড়িনি।

কিন্তু, হেগা চাঙমা সিএইচটিবিডি ফেসবুক গ্রুপে আলোড়ন খীসার একটি ছোট মন্তব্য শেয়ার করেছেন। মন্তব্যটি হলো-

 প্রতিষ্ঠান এবং প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্ট-রা বলছেন চাকমা কবিতা নাকি এখনো শিশু, শুরুর পর্যায়ে রয়েছে, আপনাদের কি মনে হয় ?

আলোচনার সময় কে বা কোন ব্যক্তি বা কেউ হয়তো ‘চাঙমা কবিতা এখনো শিশু পর্যায়ে রয়েছে’ মন্তব্য করায় তিনি এই উদ্ধৃতি দিয়ে বিতর্কের অবতারনা করতে চেয়েছেন।

আমার মনে আছে অনেক বছর আগে যখন আমি ভার্সিটির ছাত্র ছিলাম তখন একটি ছোট লিটল ম্যাগাজিনের সম্পাদকের তাগাদায় চাঙমা কবিতা নিয়ে কিছু একটা লিখেছিলাম। কিন্তু হাতের কাছে সেই লিটল ম্যাগাজিনের সংখ্যাটি না থাকায় কী লিখেছি তা তুলে ধরতে পারছি না।

তবে ওই লেখায় আমি ১৯২৯ সালে(সম্ভবত) পার্বত্য চট্টগ্রামের চাকাম রাজপরিবার থেকে প্রকাশিত ‘গৈরিকা’র যুগ থেকে শুরু করে ষাট-সত্তর দশকের চেতনামূলক কবিতা-গান রচনা, আশির দশকের “ধিবেধিব্বে অক্ত’ বা ‘বদ্ধাবস্থার যুগ’  ও নব্বই দশকে ‘জ্বলি ন উধিম কিত্তেই’ থেকে শুরু করে শুন্য দশকের সামান্য বর্ণনা করে আলোচনাটির ইতি টেনেছিলাম। তবে কী সিদ্ধান্ত টানতে চেয়েছিলাম সে কথা মনে নেই।

চাঙমা কবিতার কালাকাল বা বর্তমান অবস্থা বিচার
আজ(২৫ অক্টোবর) আলোড়ন খীসার মন্তব্যটি দেখে সংক্ষিপ্ত একটি মন্তব্য করেছি। তা-ও নিচে তুলে ধরছি-

বিষয়টিকে সামগ্রিকভাবে একটি জাতিসত্তার ভাষা-সংস্কৃতির বিকাশের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে নিজস্ব একটি মূল্যায়ন এখানে শেয়ার করছি সংক্ষিপ্তভাবে। আসলে একটি সমাজ বা জাতির ভাষা বা তার সংস্কৃতির বিকাশের পর্যায় এমন নয় যে, শুধু একটি ক্ষেত্র বা শুধু কবিতাই বিকশিত হবে অন্য ক্ষেত্রগুলো বিকশিত হবে না। আসলে এটাই স্বাভাবিক যে, যেমনটি কবিতার বিকাশ হবে তেমনটি বিকাশ হবে গল্প-উপন্যাস-নাটক-সংগীত বা সমাগ্রিকভাবে ভাষাটিরও। কিন্তু চাকমা ভাষার ক্ষেত্রে তা কেন হচ্ছে না? প্রাথমিকভাবে বলা যায় এবং খুবই ডগমেটিকভাবে যে, ভাষার বিকাশ হচ্ছে না, কারণ রাজনৈতিক অধিকারহীনতা! কিন্তু কেউ তো ‘চামেচ দিনেই ভাত হাবেই ন দিবাক’ এই বিষয়টির দিকে খেয়াল করলে দেখা যাবে, বিকাশের ‘বামনাবস্থায়’ রয়েছে আমাদের সাহিত্য, তা কবিতা থেকে শুরু করে সকলকিছু। এই বামনাবস্থা থেকে মুক্তির উপায় কী?

আমার কাছে চাঙমা ভাষা বা সাহিত্য বা কবিতার বর্তমান অবস্থাকে “শিশুকাল” বলে মনে হয়না। এ বিষয়ে হেগা চাঙমার নিচের বক্তব্যের সাথে আমার সহমত পোষণ করছি। হেগা চাঙমার বক্তব্য-

আর আপত্তিটা এখানেই যে কেউ যখন দায়িত্বশীল পদে অধিষ্ঠিত হয়ে একে শিশু হিশেবে দেখতে চায়, ভূলাতে চায়… ভূলে যায় দায়িত্ব…

 আমাদের সীমাবদ্ধতা

আমাদের কী কী সীমাব্ধতা রয়েছে বা আমরা নিজের ভাষা সাহিত্য নিয়ে আলোচনার ক্ষেত্রে আমরা কী কী সীমাবদ্ধতার চর্চা করি তার দিকে খেয়াল করে আমার কাছে মনেহয় চাঙমা কবিতা সাহিত্য বা ভাষার বিকাশের সীমাবদ্ধতা তো সেখানেই নিহিত! যেমন,

এক. আমরা চাঙমা সাহিত্য বা ভাষা বা কবিতা নিয়ে আলোচনা করি আমাদের নিজের ভাষা দিয়ে নয়! নিজের ভাষার বিকাশ এক পর্যায়ে না গেলে কিভাবে ভাষা বা সাহিত্য বা কবিতার বিকাশ হবে!? চর্চা করলেই তো বিকাশ হবে ভাষা বা কবিতার!

দুই.  আমরা যদি চাঙমা ভাষার চর্চা বা বিকাশের দিকে খেয়াল করি তবে দেখি, আমাদের নিজেদের ভাষার কোনো পত্রিকা নেই। বলা হয়ে থাকে জাতিসত্তার বিকাশ তার ভাষা বা সংস্কৃতির বিকাশের সাথে অনেকটা সম্পৃক্ত। যদি দৈনন্দিনভাবে একটি চলিত বা চলতি ভাষার চর্চার ক্ষেত্র থাকতো তবেই না সেই ভাষার বিকাশ হতো। এবং একই সাথে হোত তার কবিতা-গল্প-প্রবন্ধ-নিবন্ধ-উপন্যাস বা সকল কিছুর বিকাশ।
যতদিন পর্যন্ত এই সীমাবদ্ধতা আমরা কাটিয়ে তুলতে না পারবো ততদিন পর্যন্ত ভাষার বিকাশকে কেউ ‘শিশুকাল’ বলে ঠাউরাবে বা কেউ বলবে ‘বামন অবস্থা’, অথবা কেউ কেউ কিছুটা আত্মতৃপ্তি তুলে বলতে পারে, আমরা এগিয়ে যাচ্ছি! চাঙমা কবিতা অনেক সমৃদ্ধ!
এভাবে আমরা তিন. চার. পাঁচ বা ছয় তারও বেশি সীমাবদ্ধতা চিহ্নিত করতে পারি। তারপরে সেই সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে তুলতে পারলে ভাষার বিকাশ কেন হবে না!?

আসলে কবিতা অর্থ কী?

কবিতা নিয়ে আলোচনার আগে কবিতার মানে বা কবিতা বলতে আসলে কী বোঝায় তা নিয়ে আলোচনা করা হয়তো প্রয়োজন রয়েছে। কিন্তু এ বিষয়ে আমি তত্ত্বগত বা একাডেমিকভাবে খুব কম জানি। এই বিষয়ে আলোচনা করলে চাঙমা ভাষায় ‘বুড়ো হুদুগুলোত নক ফুদানা ধুক্কেন’ হবে বলেই মনে হয়।

বিপ্লব বা সংগ্রাম বা প্রতিরোধ আর কবিতা সমার্থক

কিন্তু রাজনৈতিক চেতনাগত দৃষ্টিভঙ্গির দিক থেকে বলতে পারি যে, কবিতা মানে বিপ্লব, কবিতা মানে নতুন কিছু!
বেশ কিছুদিন আগে ফেসবুকে নোট আকারে ছোট করে লেখা একটি মন্তব্য এখানে শেয়ার করছি-

আজ চট্টগ্রামের ডিসি হিল দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলাম। ডিসি হিলে প্রবেশ গেটে ডান দিকের দেয়ালে কবি কাজী নজরুল ইসলামকে নিয়ে একটি কয়েক লাইনের কবিতা লেখা হয়েছে। পাশে তাঁর ছবি রয়েছে ‘ ঝাকরা চুলের বাবরি দোলানো’।হঠাৎ আমার মনে হলো এই ভারতবর্ষে তো আর কোনো কবিকে দেখিনা!

বাংলাদেশ নামে এই দেশে “স্বাধীনতা তুমি .. …. …. ” দিয়ে যে কবিতা…
টি লিখেছিলেন তারপরে এখনো হয়তো কবিতা লেখা হয়। কিন্তু সত্য বলছি, আমি আর সেই কবিতার আমেজ পাইনা।

কবি হতে হলে কবিতা লিখেতে গেলেও যে রূদ্রদিনের রক্তিম লাল উথাল-পাথাল বিপ্লব লাল লালে লাল কিছু্র দরকার হয়!

নতুন কোনো কবিতা মানেই তো নতুন কোনো বিপ্লব, উত্থান-পতন-উত্তাল-উদ্বেলিত দিন! সেই উত্তাল উদ্বেলিত বিপ্লব তো এখন হাতের কাছে নেই! কবি তবে কীভাবে সৃষ্টি হবে!?

আমরা আমাদের নিজেদের সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে তুলি। তারপরে ভাষা বা কবিতার বিকাশ কেন হবে না তা নিয়ে চ্যালেঞ্জ ঘোষনা করতে পারি!

শুরু করার মাধ্যমেই মাত্র কিছু করা যায়!

Advertisement