এই পোস্টটি ৪৯৩ বার পড়া হয়েছে


পার্বত্য অঞ্চল থেকে ঢাকা শহরে শিক্ষা লাভের উদ্দেশ্যে আসা ছাত্র ছাত্রী ও বিভিন্ন কর্মজীবির আদিবাসীরা বাঙালিদের নিকট কিছু কমন প্রশ্নের স্বীকারঃ

অনেকের মতো আমার ও ধারনা নতুন কোন জায়গায় আসা হলে নতুন কিছু অভিজ্ঞতা অর্জন হয়। তেমনি জীবনে যে সব জায়গায় ঘুরেছি সে সম্বন্ধে নুন্যতম কিছু হলেও জেনেছি এবং কিছু অভিজ্ঞতা ও নিয়েছি। কিন্তু বেশ সম্প্রতি শিক্ষা লাভের উদ্দেশ্যে ঢাকায় এসে নতুন এক ভিন্ন অভিজ্ঞতার অর্জন হয়েছে। হইতো অনেকের কাছে ঢাকা অনেক পুরোনো এবং তারাও ভিন্ন এই অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে। কিন্তু আমার কাছে ঢাকা পুরাতন নয় অতি নতুন, ২ মাসের অধিক সময় ধরে এখানে থাকা সত্ত্বেও এখানখার অলিগলি রাস্তাঘাত ঠিকমতো চিনিনা যদিও এর আগে খুব অল্প সময়ের জন্য অনেকবার ঢাকায় এসেছিলাম। ছোটকাল থেকেই খাগড়াছড়ি শহরেই বেড়ে উঠেছি, আমার শৈশব, প্রাইমারী, হাইস্কুল সেখানেই কেটেছে কিন্তু ডিপ্লোমা রাঙ্গামাটি শহরে। রাঙ্গামাটি শহর পার্বত্য ও পাহাড়ী অধ্যুষিত অঞ্চল হওয়ায় বোধ হয় তখনকার সময়ে ভিন্ন এই অভিজ্ঞতার অর্জন হইনি, হইতো পার্বত্য অঞ্চল থেকে দুরে আদিবাসীহীন বরিশাল পটুয়াখালী ইত্যাদি অঞ্চল হলে ওখানে অনেক আগেই এসব ভিন্ন অভিজ্ঞতা অর্জন করা যেত। যাক সে কথা প্রসঙ্গের বাইরে গিয়ে লেখাটিকে আর দীর্ঘ করে লাভ নেই। লেখালেখির কোন অভ্যাস নেই তবু মনের মধ্যে চেপে থাকা দুঃখকে ভুলে যাওয়ার উদ্দেশ্যেই লেখার চেষ্টা। অনেক দিন ধরে লিখবো বলে ভাবছিলাম কিন্তু নানান ব্যস্ততার কারনে লেখা সম্ভব হয়ে উঠেনি। যতদিন মনের মধ্যে চেপে রেখেছি প্রতিনিয়তই যন্ত্রনা অনুভব করেছি এবং নিজে নিজেই কিছু প্রশ্নের সন্ধান খুজেছি,
কেন আদিবাসীদেরকে বাঙালিরা এত তুচ্ছ মনে করে?
আদিবাসীরা এখনো নিচ জাতি হিসেবে তাদের কাছে পরিচিত কেন, আমরা কতই যে গর্ববোধ করি নিজেকে, জুম্ম হয়ে জন্মাতে পেরেছি এবং আমরা জুম্ম?
সরকারের কাছেও আদিবাসীরা কেন এতো তুচ্ছ, যার জন্য ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী উপাধিও নিয়েছে?
আপনার কি খারাপ লাগছে না? খারাপ লাগারই কথা, যদি আমরা এসব প্রশ্নের উত্তর খুজি এবং এর থেকে মুক্তির জন্য কিছুতা হলেও চেষ্টা করি।
জানিনা লেখায় আমার মুল বিষয়টুকু তুলে ধরতে পারছি কিনা।
ভার্সিটি জীবনের প্রথম ক্লাসে গিয়ে পরিচয় অনেক বাঙ্গালি নতুন বন্ধুর সাথে এবং তেমনি আলোচনাও করেছি অনেক একে অপরের সাথে। শুরুতে হাত মেলানোর পরই প্রশ্ন কেমন আছিস?কোথা থেকে এসেছিস। উত্তরে আমি চাকমা খাগড়াছড়ি থেকে বলাতেই শুরু হলো আজব সব প্রশ্ন। যেমনঃ
আমাদের ঘর গুলো দেখতে কেমন? মাচা নাকি মাটির ঘর? সাপ ব্যাঙ কচ্চপ শুকর খাই কিনা? কোথায় ডিপ্লোমা করেছি? ঘরগুলো পাহাড়ে নাকি সমতলে, জঙ্গলে থাকি কিভাবে, বাঘ সিংহের ভয় আছে কিনা? আমাদের বিয়ে কি শুধু আমাদের মধ্যেই হয় নাকি বাঙ্গালিদের সাথেও হয়? দোস্ত তোদের চাকমা মেয়েগুলো খুব সুন্দর আমারে একটা ঠিক করে দিস। আমাদের অনেক বাঙ্গালিই তো চাকমা মেয়ে বিয়ে করেছে, তাদের মতো আমরা ও কি পারি না? তোদের এখানের মদ জীবনে ও খাইনি, একবার বেড়ানোর জন্য যেতে হবে পার্বত্য এলাকায়। ইত্যাদি নানা বিরক্তিকর প্রশ্ন। শুনতে বিরক্তিকর লাগলেও এমন প্রশ্ন শুনতে হবে এটা স্বাভাবিক, কারন আমরা এখনো অনেক পিছিয়ে আছি।
পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা শহরে পড়তে আসা অনেক ছাত্র ছাত্রী বন্ধু আত্নীয়ের কাছ থেকে শুনেছি, তারাও এমন অনেক প্রশ্নের সম্মুখীন হয়েছে। জানিনা তারা প্রশ্নগুলো কিভাবে নিয়েছে, যদি
কিছুটা হলেও যন্ত্রনাদায়ক বা বিরক্তিকর বোধ করে তাহলে নিশ্চয় তাদের কিছুটা হলে ভাবাবে এবং কিভাবে এসব প্রশ্ন থেকে মুক্তি পাওয়া যায় সে চেষ্টায় থাকবে।
২০০৬সালে বাবা সিলেট ফেঞ্চুগঞ্জে চাকুরী করার সুবাদে তার সাথে সেখানে বেড়াতে গিয়েছিলাম, সেখানেও এমন কিছু প্রশ্নের সম্মুখীন হয়েছি এবং যথাসম্ভব কিছুটা এড়িয়েও গিয়েছি। কিন্তু ঢাকায় এসে আবারও নতুন করে এসবের সম্মুখীন। অবাক! ভার্সিটির কিছু বন্ধু বাদেও স্থানীয় কিছু দোকানির কাছ থেকেও শুনতে হয়েছে।
এবং কিছু প্রশ্নের জবাব দিয়ে যথাসম্ভব এড়িয়েও গিয়েছি। এখন এমন প্রশ্ন শুনলে খুবই বিরক্তিকর লাগে। কারন তারা আমাদের সম্বন্ধে সবকিছু জানা সত্ত্বেও হেনস্থা করার উদ্দেশ্যে এসব প্রশ্ন করে থাকে। প্রথম কয়েকদিন বুঝতেই পারিনি কিন্তু পরে ঠিকই বুঝে নিয়েছি, কিসের উদ্দেশ্যে তাদের এই প্রশ্ন। কারন সাভার মিরপুর উত্তরার বাঙ্গালিদের কাছে এসব প্রশ্ন মোটেই আশা করার কথা নয়, তারা প্রতিনিয়ত জুম্ম নাক চ্যাপ্টা দেখে এসেছে, বিশেষ করে যারা সাভার গাজীপুর থেকে। তাই এবার সবই উল্টাপাল্টা জবাব দিয়ে থাকি।
যেমনঃ দোস্ত কি খবর?
ভালো।
দোস্তর বাড়ি কোথায় যে?
খাগড়াছড়ি।
তোদের বাসা গুলা কি মাচার?
না। সব পাকা বিল্ডিং।
পাহাড়ে কিভাবে পাকা বিল্ডিং নির্মান করেন?
খাগড়াছড়ি রাঙামাতি বান্দরবান এগুলো সমতল জায়গা। কিন্তু সমতলের মধ্যে কিছু পাহাড় আছে বলেই পাহাড়ী অঞ্চল বলে।
দোস্ত তোরা নাকি ব্যাঙ সাপ শুকর খাস?
ব্যাঙ সাপ শুকর এদের কি প্রান নেই? আমাদের ধর্মে প্রানীহত্যা মহাপাপ। তোরা তো নিষ্ঠুর, গরু জবাই করে উত্‍সব করছ। আজ থেকে তোদের গরুগুলো আর দুধ দিবে না।
ডিপ্লোমা কোথায় করছিস?
রাঙামাটি।
ওইটা কি জঙ্গলে?
না একদম সদরে। বিরাট এলাকা জুড়ে বিস্তৃত আমাদের ক্যাম্পাসের ভবনগুলো। এরকম বড় এ টি আই বোধ হয় বাংলাদেশে কোন জায়গায় নেই। যদিও ম্যানেজমেন্ট খুব খারাপ। কারন অধ্যক্ষ কর্মকর্তারা ম্যাক্সিমাম বাঙালি। সব দুর্নীতিবাজ।
দোস্ত তোদের এখানে বেড়াতে যাইতে হবে নিয়ে যাবি?
না যাইস না, তোদেরকে বাঘ সিংহ খেয়ে ফেলবে।
কিসে করে যাও তোমরা গাড়ি নাকি ট্রেন?
আপাতত গাড়ি। আমাদের খাগড়াছড়িতে নিউজিল্যান্ড নামে একটা এলাকা আছে খুব সুন্দর। বুজতেই তো পারছিস, নিউজিল্যান্ড নামানুসারে। ঐখানে এবার একটা এয়ারপোর্ট তৈরী করা হচ্চে। প্লেনে করে খাগড়াছড়ি যেতে পারবো।
ইত্যাদি ইত্যাদি।
হইতো যারা আজ পর্যন্ত জুম্ম নাক চ্যাপ্টা দেখেই নি হইতো তাদের প্রশ্নের যথাযথ জবাব দিতাম।
মনে মনে ভাবি শুধু শুধু আমাদের হেনস্থা করে কি লাভ তাদের? সব বাঙ্গালিরা কি এমনই?
এসব প্রশ্নের মুলে দায়ী কে? আমি নাকি পুরো জুম্ম জাতি?
লেখা আর দীর্ঘ করবোনা। তবু শুধু বলতে চাই, আমি জুম্ম, আমি চাকমা। আমি গর্বিত যে চাকমা মায়ের গর্ভে জন্ম নিতে পেরেছি। এতক্ষন ধৈর্ষ্য সহকারে সাথে থাকার জন্য অনেক ধন্যবাদ।

Advertisement