এই পোস্টটি ৬৬১ বার পড়া হয়েছে


বুদ্ধের অনুচর ভিক্ষু আনন্দ: আজীবন এক শিক্ষার্থী, অনুসরণীয় এক ব্যক্তিত্ব

 

 

বৌদ্ধ ধর্মের প্রবর্তক গৌতম বুদ্ধ। ৪৫ বছর ধরে তিনি ধর্ম প্রচার করেছিলেন। ৮০ বছর বেঁচে ছিলেন। তাঁর বয়স যখন ৫৫ তখন তিনি অনুভব করেন, এই বয়সে তাঁকে পরিচর্যা বা তাঁর ভালোমন্দ দেখাশোনা করার জন্য একজন সহচর প্রয়োজন।

অনেক বিচার বিবেচনা করে তিনি ভদন্ত আনন্দকে তাঁর সহচর করেন।

 

সহচর বা অনুচর বা পরিচর্যাকারী হবার আগে আনন্দ গৌতম বুদ্ধকে বলেন যে আটটি প্রার্থনা পূরণ করলেই তবে তিনি গৌতম বুদ্ধের অনুচর হতে রাজি থাকবেন।

 

 

সেই ৮টি প্রার্থনা হচ্ছে-

 

.         বুদ্ধ আনন্দকে সুন্দর কাপড়চোপড় প্রদান করবেন না। এবং বুদ্ধ যে কাপড় পরেন তা নতুন বা পুরাতন হোক তা তিনি ব্যবহার করবেন না।

.         লোকে গৌতম বুদ্ধ বা ভগবানকে যে খাবার অর্পন করবে তা কোনো অংশই আনন্দ গ্রহণ করবেন না।

.         ভগবান গৌতমকে কেউ আমন্ত্রণ করলে সেই নিমন্ত্রণে গিয়ে তিনি ভোজন করবেন না।

.         তবে যে স্থানে আনন্দ নিমন্ত্রিত হবেন সে স্থানে ভগবান গৌতম যাবেন।

.         অনুচর হবার পর থেকেই আনন্দ স্বতন্ত্র কুটিরে থাকবেন না বা কোনো স্বতন্ত্র কুটির তাঁর জন্য নির্দিষ্ট থাকবে না।

.         কেউ যদি ভগবান গৌতমের দর্শনাভিলাষী হয়ে আসেন, তবে আনন্দ তাকে বা তাদেরকে ভগবান গৌতমের কাছে নিয়ে যেতে পারবেন।

.         অসময় ব্যতীত অন্ যে কোনো সময়ে যখনই আনন্দ কিছু জানার জন্য ব্যাকুল হবেন তখনই তিনি ভগবানের গৌতমের কাছে যেতে পারবেন।

.         ভগবান গৌতমের কাছে তাঁর দেশনা সম্পর্কে জানতে চাইলে ভগবান গৌতম তা জানাবেন।

 

এই সকল প্রার্থনাই ভদন্ত আনন্দ গৌতম বুদ্ধের কাছে করেছিলেন। এবং ভগবান গৌতম আনন্দের এই প্রার্থনা বা শর্ত অনুমোদন করেন।

গৌতম বুদ্ধের সময়কালীন বৌদ্ধ শিষ্যদের মধ্যে আনন্দ ছিলেন নানা গুণের অধিকারী। তিনি শান্তশিষ্ট, কর্মদক্ষ ও কর্তব্যপরায়ণ। এছাড়া তিনি ছিলেন মধুরভাষী ও একই সাথে শ্রুতিধর। যা শুনতেন তিনি তা হুবহু মনে রাখতে পারতেন বলে বলা হতো।

 

তিনি গৌতম বুদ্ধের সহচর হবার আগে যে সকল শর্ত বা প্রার্থনা গৌতম বুদ্ধের কাছে রেখেছিলেন তার মধ্যেই প্রমাণ পাওয়া যায় তিনি একাধারে গৌতম বুদ্ধের সম্মানার্থে তাঁর সকল কিছ রক্ষনাবেক্ষন বা পরিচর্যার জন্য  নিজেকে যেমন উৎসর্গীকৃত করেছিলেন; তেমনি কিন্তু একই সাথে নিজের মান ও মর্যাদাকে সমুন্নত রাখতে ছিলেন সচেষ্ট।

 

তিনি যেন গৌতম বুদ্ধের অনুগ্রহভাজন না হন বা তার মর্যাদা যেন অক্ষুণ্ন থাকে সে জন্যে গৌতম বুদ্ধের কাপড়চোপড় তিনি ব্যবহার না করার কথা যেমন বলেছেন তেমনি গৌতম বুদ্ধকে কেউ নিমন্ত্রণ করলে সেখানে তিনি যাবেন না বলে বুঝিয়েয়েছেন যে তিনি গৌতম বুদ্ধের অনুগ্রহ হয়ে থাকতে চাননি।

 

কিন্তু একই সাথে তিনি নিজের জন্য কোনো কুটির না রাখার ঘোষনা দিয়ে এই কথাই বলতে চেয়েছেন যে, যেদিন থেকে তিনি ভগবান গৌতমের অনুচর হচ্ছেন সেদিন থেকেই তিনি তাঁর সর্বস্ব ভগবান গৌতমের জন্যই সমর্পন করলেন।

 

 

এভাবেই ভগবান গৌতম যেমন একজন সুযোগ্য অনুচর পেলেন তেমনি আনন্দ এই গুরু দায়িত্ব পালনের জন্য গ্রহণ করেছিলেন কঠোর ব্রত। এভাবেই গুরুশিষ্য পরষ্পর পরষ্পরকে মান মর্যাদা অক্ষুণ্ন রেখে চলেছিলেন।

প্রায় ২৭ বছর ধরে তিনি বুদ্ধের অনুচর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন।

 

থেরগাথায় তিনি প্রজ্ঞা বা জ্ঞান সম্পর্কেবলেছিলেন, যে অল্পশ্রুত বা অল্প জানে সে যেন এক বলশালীর মতো। তার শরীরে শক্তি অর্জন হয়। কিন্তু প্রজ্ঞা বর্ধিত হয় না।

 

 

আর যে ব্যক্তি বহুশ্রুত বা বহু জ্ঞান যিনি লাভ করেন, কিন্তু অল্পশ্রুত বা অল্পজ্ঞানী বা কম জানা ব্যক্তিকে অবজ্ঞা করেন তিনি যেন প্রদীপধারী কিন্তু অন্ধ। অর্থাৎ তার জ্ঞান রয়েছে। কিন্তু তিনি তারপরেও অন্ধ বা তার হাতে থাকা প্রদীপের তিনি সদ্ব্যবহার করতে সমর্থ নন। অর্থাৎ এই কথায় বোঝানো হয়েছে, জ্ঞানী ব্যক্তির যদি অহমবোধ বা আত্ম অহংকার থাকে তবে তিনি জ্ঞানকে ব্যবহার করতে সমর্থ হবেন না।

 

এরপরে তিনি ভগবান গৌতমের সাথে তার অনুচর জীবনে কথা স্মরণ করে বলেছিলেন যে, তিনি ছায়ার মতো গৌতমের সাথে ছিলেন। তিনি সবসময় শিক্ষার্থী হিসেবেই ভগবান বু্দ্ধের কাছ থেকে শিখে গেছেন।

এবং শেষ পর্যন্ত তিনি শিক্ষার্থী হিসেবে থেকেই নির্বানপ্রাপ্ত হলেন। এবং তিনি বললেন, আমার শাস্ত্রীয় পরিচর্যা বা গৌতম বুদ্ধের পরিচর্যা সমাপ্ত হয়েছে, বুদ্ধের অনুশাসন পালন সম্পন্ন হয়েছে, গুরুভার বহন করা সমাপ্ত হয়েছে এবং পূর্ণভব বিনাশপ্রাপ্ত হয়েছে। তিনি নির্বানলাভ করলেন।

Advertisement