এই পোস্টটি ৩০৩ বার পড়া হয়েছে


সাহিত্য শিল্পকে যারা কৃত্রিম বলে অবজ্ঞা করে তারা সত্যকে জানে না

শিরোনামটির মন্তব্য বা বক্তব্য আমার নয়। এই বক্তব্য রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের। তিনি ‘সত্য ও বাস্তব’ নামে ছোট এক প্রবন্ধে তাঁর এই মন্তব্য প্রকাশ করেন (প্রবন্ধটির প্রকাশকাল জুন, ১৯৪১)। এই প্রবন্ধটি ‘সাহিত্যের স্বরূপ’ নামক প্রবন্ধ সমষ্টির  অংশ।

আজ আমি তাঁর এই লেখাটিকে উপজীব্য করে সাহিত্য শিল্পকে দেখার চেষ্টা করবো! পার্বত্য চট্টগ্রামের সাহিত্য বা শিল্পকে আমরা কীভাবে দেখবো তা এই ছোট প্রবন্ধে যেন উল্লেখ রয়েছে!

 মানুষ চায় মনের মতো
তিনি তাঁর এই প্রবন্ধে বলছেন-

মানুষ আপনাকে ও আপনার পরিবেষ্টন বাছাই করে নেয় নি। সে তার পড়ে-পাওয়া ধন। কিন্তু সঙ্গে আছে মানুষের মন; সে এতে খুশি হয় না। সে চায় মনের-মতোকে।

মানুষ কেন মনের মতো চায়?  রবি ঠাকুর বলছেন-

সে সম্পূর্ণ রূপ নিয়ে জন্মগ্রহণ করে নি; তাই আপনার সৃষ্টিতে আপনার সম্পূর্ণতা বরাবর সে অর্জন করে নিজেকে পূর্ণ করেছে। সাহিত্যে শিল্পে এই-যে তার মনের মতো রূপ, এরই মূর্তি নিয়ে ছিন্নবিচ্ছিন্ন জীবনের মধ্যে সে আপনার সম্পূর্ণ সত্য দেখতে পায়, আপনাকে চেনে।

তিনি আরো বলছেন-

বড়ো বড়ো মহাকাব্যে মহানাটকে মানুষ আপনার পরিচয় সংগ্রহ করে নিয়ে চলেছে, আপনাকে অতিক্রম করে আপনার তৃপ্তির বিষয় খুঁজছে সেই তার শিল্প, তার সাহিত্য। দেশে দেশে মানুষ আপনার সত্য প্রকৃতিকে আপনার অসত্য দীনতার হাত থেকে রক্ষা করে এসেছে। মানুষ আপনার দৈন্যকে, আপনার বিকৃতিকে বাস্তব জানলেও সত্য বলে বিশ্বাস করে না। তার সত্য তার নিজের সৃষ্টির মধ্যে সে স্থাপন করে। রাজ্যসাম্রাজ্যের চেয়েও তার মূল্য বেশি।

সাম্রাজ্যের চেয়ে দামি সাহিত্য শিল্প

হ্যাঁ, রবি ঠাকুর সত্য কথাই বলেছেন! মানুষ তার আপন সীমাবদ্ধতাকে বা দীনতাকে সত্য বলে বিশ্বাস করতে চায় না বলেই সাহিত্যে তার স্বপ্নকে লালন করে, শিল্পে নিজের পূর্ণতাকে খুঁজে নিতে চেষ্টা করে। এবং এই সৃষ্টিই তাকে অমূল্য রতন দিয়ে দেয়! তার সাথে রাজ্যসাম্রাজ্যেরও যে তুলনা হয় না!
কী সেই সাহিত্য বা কী সেই শিল্প যা রাজ্য সাম্রাজ্যের চেয়ে দামি হয়ে ওঠে? কেন তা এত দামি হয়ে ওঠে?
নিজেকে বা নিজের চারিপার্শ্বকে পরিপূর্ণতা দেয়ার সাহিত্যিক প্রচেষ্টাই তো তার কাছে দামি মূল্যবান এমনকি সাম্রজ্যের চেয়েও! সাম্রাজ্য রাজ্য ধ্বংস হয়ে যায়। কিন্তু সাহিত্য শিল্প যা সমাজের দর্পণ এবং একই সমাজ জাতির অপূর্ণতাকে পরিপূর্ণতা দেয়ার ‘হাতিয়ার’, তা শত শত বছর ধরে টিকে থাকে, শত শত বছর ধরে সেই সৃষ্টি সমাজ জাতিকে পথ দেখায়, পথের নিশানা দেয়।
এই বহমান অমূল্য সম্পদকে যে সমাজ বা জাতি অবজ্ঞা করতে চায় সে যে সত্যকেই জানে না!

রবি ঠাকুর বলছেন-

যেখানে মানুষের আত্মপ্রকাশের অশ্রদ্ধা সেখানে মানুষ আপনাকে হারায়। তাকে বাস্তব নাম দিতে পারি, কিন্তু মানুষ নিছক বাস্তব নয়। তার অনেকখানি অবাস্তব, অর্থাৎ তা সত্য। তা সত্যের সাধনার দিকে নানা পন্থায় উৎসুক হয়ে থাকে। তার সাহিত্য, তার শিল্প, একটা বড়ো পন্থা।

সত্য ও বাস্তব

‘সাহিত্য শিল্পকে যারা কৃত্রিম বলে অবজ্ঞা করে তারা সত্যকে জানে না।’ তারা জানে না সাহিত্য ও শিল্প বাস্তব এবং খুবই জীবন ঘনিষ্ট! এই জীবনকে আপনারা আমার কী চোখে দেখতে চাই? এই বাস্তব সত্যকে আমরা কীভাবে গড়তে চাই?

আপনাকে অতিক্রম করে কীভাবে আমরা নিজের জন্য, জাতি বা সমাজের জন্য তৃপ্তির-গর্বের-গৌরবের এক নিরবিচ্ছিন্ন জীবনবোধ উপহার দিতে পারি তাই কি আজ আমাদের সাহিত্যিক শিল্পী লেখিয়ে লেখকদের ভাবনার বিষয় হওয়া প্রয়োজন নয়? চলমানতাকে রূদ্ধ করা কি তার কর্তব্য? সে কি তবে বেঁধে নিতে চায়, বেঁধে রাখতে চায় বহমানতাকে?

বদ্ধ দুয়ার রূদ্ধ অবস্থাকে নয়, কৃত্তিমতাকে নয়, অসত্যকে নয়, পর বৃত্তিশীলতাকে নয়, পরশাল্যকে নয়! আসুন! সত্য ও বাস্তবকে তুলে ধরি! উচ্চে তুলে ধরি বহমানতাকে, বিকাশমানকে, ইতিহাসের চলমান বহমান স্রোতকে!ইতিহাস মানে তো তুমি আমি! আমরা! আমাদের মান মর্যাদা আত্ম মর্যাদা কেন তবে ভুলুন্ঠনে! স্রোত কে রূদ্ধ করে? কে?

প্রকৃত শিল্পী সাহিত্যিক বা লেখক কি তা হতে দেবে? না, কখনো ই নয়, কখনোই হতে দেবে না! ! !

কারণ শিল্প সাহিত্য কচুরিপানা থেকে জন্মায় না, জন্মায় না শেওলা থেকে…
তার জন্ম বাস্তব হতে, সত্য থেকে, সত্য চলমান…

Advertisement