এই পোস্টটি ৫৬০ বার পড়া হয়েছে


লড়াই সংগ্রাম আন্দোলন বা কর্মসূচি গ্রহণ বিষয়ে মতামত

কৈফিয়ত হিসেবে বলছি, আমি লেখক নই। লিখি নিজের চিন্তাকে সমৃদ্ধ করার জন্য। নিজের দৃষ্টিভঙ্গিকে আরো পোক্ত করার জন্য।

(ক)
প্রথমে বলে রাখি যে আমি এখানে আমি যে মতামত প্রদান করি তা আমার নিজস্ব মতামত মাত্র। আসলে নানা বিষয়ে আমি জানার পর বা জানার চেষ্টা করার পরে আমার মনের মধ্যে যে চিন্তা খেলে তা-ই আমি এখানে বা ব্লগে শেয়ার করার চেষ্টা করি মাত্র।

(খ)
জাতীয় বৃহত্তর বিষয়ে লড়াইয়ের নীতি কৌশল নিয়ে কথা বলা আমার জন্য সাজে না। অনেক কিছুই আমার ভালোমতো জানা নেই।

কিন্তু আমার মনে হলো যারা বা যে সকল সংগঠন দেশের স্বার্থে তথা জনগণের মঙ্গল বা অধিকার আদায়ের স্বার্থে লড়াই করেন তাদের আন্দোলন করার সময় বা আন্দোলনের কর্মসূচি প্রদানের সময় অবশ্যই কিছু বিষয়ে খেয়াল করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এবং এ বিষয়ে যা ভাবছি তা আমার কাছে মনে হয়েছে অন্যদেরও জানানো দরকার। তাই এই লেখার অবতারনা।

(গ)
এটা বলা যেতে পারে যে, যেকোন সমাজ বা দেশের মধ্যে তা শাসক শ্রেনী বা নিপীড়িত শ্রেনী বা অধিকারকামী শ্রেনী বা গোষ্ঠী যে-ই হোক তাদের অবশ্যই কর্মসূচি গ্রহণ করতে হয়। শাসকশ্রেনীকে কর্মসূচি বা কার্যক্রম গ্রহণ করতে হয়- উক্ত শ্রেনী যে স্বার্থের প্রতিনিধিত্ব করেন তা যেন রক্ষিত থাকে তেমন ধরণের কর্মসূচি। শাসক রাজনৈতিক দলকেও সেই ভাবেই কর্মসূচি নিতে হয়। বিরোধী ক্ষমতাকামী শ্রেনীকেও সেদিকে খেয়াল রেখে কর্মসূচি নিতে হয়। তার নিজের শ্রেনী বা গোষ্ঠী স্বার্থের হানি যেন না ঘটে সেভাবেই বিরোধী ক্ষমতাকামী শ্রেনীকেও কর্মসূচি নিতে হয়। অর্থাৎ, বরঞ্চ শ্রেনী স্বার্থ যাতে অটুট থাকে সেভাবেই তারা কর্মসূচি নেয়।

(ঘ)

বর্তমানে আওয়ামী নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার মনে করছে, দেশের শাসনব্যবস্থাকে মৌল ভিতের উপরে দাঁড় করাত হলে ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা সংগ্রামের চেতনাকেই মৌল হিসেবে ধরে নিয়ে তাকে রক্ষা করার বা তাকে উর্দ্ধে তুলে ধরার-ই কর্মসূচি নিতে হবে। তারা বা এই অংশের প্রতিনিধিত্বকারী শাসনক্ষমতাকামীরা মনে করছেন দেশের মধ্যে আদর্শের প্রধান দ্বন্দ্বটি হচ্ছে- ৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের স্বপক্ষবাদী এবং বিপক্ষবাদী। এবং এ ক্ষেত্রে এই অংশটি নিজেদেরকেই স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রধান “কান্ডারী” বলেই মনে করে থাকে!এবং সেভাবেই তারা অন্যদের বিষয়ে বক্তব্য বা বিশ্লেষণ বা মতামত দিয়ে থাকে।
বিপরীতে ক্ষমতাকামী বিরোধী পক্ষ এ বিষয়ে ভিন্নমত পোষন করে। তবে যেহেতু দেশকে ভালোবাসা বা স্বাধীনতাযুদ্ধের বিষয়টি খুবই স্পর্শকাতর বিষয় বিধায় তারাও এর বিপরীতে পাল্টা স্বর্শকাতর বিষয়কে লাইমলাইটে আনার চেষ্টা করে থাকেন। এবং তা হচ্ছে, জনগণের মধ্যে থাকা ধর্মীয় সেন্টিমেন্ট। তবে এই সেন্টিমেন্টের ব্যবহার তেমন কার্যকরি হয় না তার অতিস্পর্শকাতরতার কারনেই! এটা দ্বিধারী তলোয়ারের মতো ক্ষমতাসীন পক্ষ বা ক্ষমতাবহির্ভূত পক্ষ দুপক্ষকেই বিপদে ফেলতে পারে বলে এর ব্যবহার এখন সীমিত বলেই মনে হচ্ছে।

কিন্তু, ক্ষমতা বহির্ভূত পক্ষের তো চুপচাপ কর্মসূচিবিহীনভাবে থাকা সম্ভব নয়! তাই এই পক্ষ এখন বেছে নিয়েছে “মুলো ঝুলানো” কর্মসূচি। মূলোটা হচ্ছে, আমরাই ক্ষমতায় যা্ছি! আগামীতে যেহেতু আমরাই ক্ষমতায় যাচ্ছি তাই এখন সময় ক্ষেপন করলেও তেমন বিশেষ কিছু যায় আসবে না! আন্দোলন আন্দোলনের যে জিগির মাঝে মাঝে তোলা হয়ে থাকে তা আসলে জনতার মনকে চাঙ্গা রাখারই প্রচেষ্টা মাত্র! আর এভাবেই এই পক্ষটি বা ক্ষমতাবহির্ভূত অংশটি তার পেছনে জনগণকে রাখার চেষ্টা করে।

(ঙ)

কিন্তু ক্ষমতাকামী  বা ক্ষমতালিপ্সু এই পক্ষ-বিপক্ষ দলসমূহের একটি বিরাট সমস্যা রয়েছে। তা হচ্ছে, তাদের যেমন একই সাথে জনগণকে নিজেদের দলে ভেড়াতে নানা কসরত করতে হয়। তেমনি, জনগণ আরো গভীরে গিয়ে নিজেদের অধিকার ও দাবিনামা বিষয়ে সচেতন ও ঐক্যবদ্ধ হয়ে যেন লড়াই করার শক্তি অর্জন না করে সে বিষয়েও তাদের খেয়াল করতে হয়।

এজন্য এ সকল সংগঠনসমূহ জনগণের মৌলিক দাবি নিয়ে তেমন উচ্চবাচ্য করে না। করলেও এ নিয়ে লড়াই করেনা।

এ জন্য বর্তমানে ক্ষমতায় থাকা গোষ্ঠী  সময় ক্ষেপণ করছে ‘স্বাধীনতা ভুলুণ্ঠিত হচ্ছে’রাজাকার-যুদ্ধাপরাধী-স্বাধীনতাবিরোধী ক্ষমতা নিয়ে নেবে’ ইত্যাদি আওয়াজ তুলে। অন্যদিকে ক্ষমতাবহির্ভূত অংশটি আওয়াজ করছে নির্বাচন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি তুলে। এবং এই সকল দাবি হচ্ছে তাদের প্রধান দাবিনামা এবং এগুলোর ওপর ভিত্তি করেই তাদের কর্মসূচি পরিচালিত হয়।

তাদের কাছে দ্বন্দ্ব বা মূল সমস্যা হচ্ছে ক্ষমতা। কে ক্ষমতায় থাকবে বা কে ক্ষমতায় যাবে তা নিয়েই তাদের চিন্তাভাবনা বিস্তৃত!

এবং ক্ষমতায় থাকা গোষ্ঠী এবং ক্ষমতাবহির্ভূত গোষ্ঠী  এদিক থেকে একই ভাবধারাই বহন করে।

এবং জনগণের মৌলিক দাবি বা অধিকার আদায় নিয়ে তাদের উপর বিশ্বাস বা আস্থা রাখা এক অর্থে যায় না বলেই বলা যায়।

 

(চ)

এখন আমরা আলোচনায় আসবো সেই সকল সংগঠন বিষয়ে যারা নিজেদেরকে ‘নিপীড়িত জনগণের প্রতিনিধি’ বলে থাকেন তাদের নিয়ে।

এসকল সংগঠনসমূহ দেশের মধ্যে তেমন শক্তি অর্জন করতে পারেনি। কিন্তু নিপীড়িত জনগণের অধিকার আদায় নির্ভর করছে এই সকল সংগঠন সমূহের উপরই।

কিন্তু তারা কী ধরণের কর্মসূচি গ্রহণ করছেন? তারা কী নিয়ে লড়াই করছেন? তারা কি সংখ্যাগরিষ্ঠ নিপীড়িত জনগণের স্বার্থকে নিয়ে লড়াই করছেন? তারা কি দেশের বিভিন্ন শ্রেনী পেশার নিপীড়িত জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করার জন্য বাস্তব কর্মসূচি দিচ্ছেন?

তারা কি বর্তমানে যে ইস্যু নিয়ে মাঠে নামা দরকার সে ইস্যু নিয়ে মাঠে নামছেন? তারা কি সমস্যার গভীরে গিয়ে মূল সমস্যাকে চিহ্নিত করতে পেরেছেন? তারা কি মার্ক্সবাদে বর্ণিত প্রধান দ্বন্দ্ব এবং অপ্রধান দ্বন্দ্ব চিহ্নিত করতে পেরেছেন?

সর্বোপরি তারা বাস্তবে কী ধরনের কর্মসূচি নিয়ে অগ্রসর হচ্ছেন? এই কর্মসূচির মাধ্যমে কী লক্ষ্য অর্জনের চেষ্টা তারা করছেন? কর্মসূচির মাধ্যমে কি তারা শুধু একটি দাবিই করছেন? নাকি পুরো দেশের খোলনলচে পাল্টানোর কর্মসূচি নিয়ে এগোচ্ছেন? তারা যে কর্মসূচি দিয়েছেন তাতে জনগণের অংশগ্রহন কতটুকু? জনগণের স্বার্থই বা কতটুকু?জনগনের আশু স্বার্থ বা মৌলিক স্বার্থ কতটুকু? বা শাসনব্যবস্থাকে মৌলিকভাবে বদল করার ক্ষেত্রে এই কর্মসূচিই ভূমিকা কতটুকুই বা থাকবে?

এবং এই কর্মসূচি বা আন্দোলনের মাধ্যমে জনগণ কী শিক্ষা অর্জন করছে? জনগণ এই আন্দোলন থেকে বস্তুগতভাবে কিছু লাভ করছে কি?

আমার মতে আন্দোলন সংগ্রাম বা লড়াই করার সময়ে এই সকল বিষয়ে খেয়াল রেখেই সংগ্রামী বা নিপীড়িত জনগণের দলসমূহকে কর্মসূচি নেয়া প্রয়োজন।

 

(ছ)

এই সকল বিষয়ের কথা চিন্তা করেই আমি বলতে চেয়েছিলাম যে, যে সকল সংগঠন বা সমষ্টি সত্যিকারভাবেই দেশের তথা জনগণের অধিকাংশ অংশের ভালোর জন্য কিছু করতে চান তাদেকে অবশ্যই বিভিন্ন বিষয়ে দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করে  কর্মসূচি গ্রহণ করতে হয়।

এবং তার মধ্যে প্রধান বা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হচ্ছে যে, লড়াই সংগ্রাম বা কর্মসূচি নির্ধারণেও শাসকগোষ্ঠীর সাথে নিপীড়িত জনগণের মধ্যে মূল দ্বন্দ্ব বা প্রধান দ্বন্দ্ব এবং অপ্রধান দ্বন্দ্ব এ বিষয়ে ধারণা রেখে কর্মসূচি নেয়া।

বাংলাদেশে বর্তমানে শাসক শ্রেনীর সাথে শোষিত শ্রেনী বা নিপীড়িত শ্রেনীর মধ্যে কোন দ্বন্দ্বটি মুখ্য রূপে রয়েছে?

এটা ভারতীয় সম্প্রসারণবাদী বা সাম্রাজ্যবাদীর সাথে বাংলাদেশের নিপীড়িত জনগণের মধ্যে দ্বন্দ্ব? নাকি মার্কিন(টিকফা ..) সাম্রাজ্যবাদের সাথে দেশের নিপীড়িত জনগণের মধ্যে দ্বন্দ্বটি সবথেকে বড়?

নাকি নিপীড়িত শোষিত জনগণের উপর গার্মেন্টস মালিক বা দেশীয় শোষকগোষ্ঠী-সাম্রাজ্যবাদী শক্তিপক্ষের শোষন নিপীড়ন যা একই সাথে সাম্রাজ্যবাদী এবং একই সাথে সরাসরি নিপীড়িত জনগণের শ্রম-ঘামের উপর জুলুমদারী এই দ্বন্দ্বটিই মুখ্য?

আন্দোলন সংগ্রামে কর্মসূচি বা দাবিনামাও ঠিক করতে হয় মৌলিক দ্বন্দ্ব বা প্রধান দ্বন্দ্ব এবং অপ্রধান দ্বন্দ্ব বিষয়গুলোকে খেয়াল করে এটাই আমি জানি।

তাই  এই মন্তব্য করলাম।

তবে এখানে প্রাসঙ্গিকভাবে এটাও বলে রাখা প্রয়োজন যে, যেকোনো বিষয়ের ক্ষেত্রেই অবস্থান-পরিস্থিতি প্রেক্ষাপট বা সময়কে  কিন্তু অতি অবশ্যইভাবে বিবেচনায় আনতে হয়।

ভারতের নেতৃত্বে রামপাল বিদ্যুতকেন্দ্র নির্মানের নামে সুন্দরবন ধ্বংসের যে চক্রান্ত তা রুখে দাড়ানোর জন্য তেল গ্যাস বিদ্যুত বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটি যে লংমার্চ করছে তার প্রতি সংহতি জানিয়ে আমি এই মতামত মাত্র প্রদান করলাম।

প্রাসঙ্গিক বিবেচনা করে: কর্মসূচি গ্রহণ করার সময় কী কী বিষয়ে খেয়াল রাখতে হয় এ নিয়ে আমি একটি ছোট লেখা এই ব্লগে লিখেছি।

কেউ চাইলে তা-ও পড়ে নিতে পারেন।

Advertisement